প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও সেই পথ অনুসরণ করতে হবে—মুম্বইয়ের বিক্ষোভ থেকে এমনই রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি দিলেন ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দীপকে। শুক্রবার, ২ অক্টোবর, গান্ধীজয়ন্তীতে শিবাজি পার্কের বাইরে আয়োজিত এই কর্মসূচির কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের দেশব্যাপী বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। আন্দোলনকারীরা জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে সরব হন।

পুলিশের অনুমতি না মেলা সত্ত্বেও দাদরের ঐতিহাসিক শিবাজি পার্কের বাইরে সমবেত হন হাজার হাজার মানুষ। অনেকের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা, কারও হাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ইস্তফা চেয়ে লেখা প্ল্যাকার্ড। তরুণদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সের নাগরিকও বিক্ষোভে যোগ দেন। অভিনেত্রী শাবানা আজমি, অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, গায়ক ও সুরকার বিশাল দাদলানি-সহ সাংস্কৃতিক জগতের পরিচিত মুখগুলির উপস্থিতি কর্মসূচিকে আরও নজরে আনে। ‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো’ স্লোগানও ওঠে জমায়েতে।

দীপকের বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয় কেন্দ্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়ের প্রশ্ন। জ্ঞানেশের অপসারণের দাবিকে তিনি মোদী সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখান। তাঁর অভিযোগ, কমিশনের ভূমিকা শাসকদলকে সুবিধা করে দিচ্ছে। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিদায়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বিদায়কে যুক্ত করা দীপকের রাজনৈতিক বক্তব্য; সেটিকে কোনও নির্ধারিত সাংবিধানিক পরিণতি হিসেবে দেখার অবকাশ নেই।

সিজেপির দাবিপত্রে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম শুরুর কথাও রয়েছে। সংগঠনটি জানতে চায়, বিতর্কিত পদক্ষেপগুলির নির্দেশ কারা দিয়েছিলেন। তাদের অন্য দাবিগুলি হল এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা, ২০২৫ সালের জানুয়ারির ভোটার তালিকা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ২০২৩ সালের আইন বাতিল করা। পরিবর্তে নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে আরও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা চেয়েছে তারা।

শাবানা আজমির বক্তব্যে উঠে আসে ভোটাধিকার রক্ষার প্রয়োজন। তাঁর কথার মর্মার্থ, ছোটবেলা থেকে নাগরিকেরা শুনে আসছেন যে ভোট দেওয়া তাঁদের অধিকার; সেই অধিকার নিয়েই প্রশ্ন উঠলে প্রতিবাদ করতেই হয়। দেশ ও সংবিধানের প্রতি নাগরিকের দায়ের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বিশাল দাদলানির উপস্থিতিও তরুণদের এই প্রতিবাদে সাংস্কৃতিক জগতের সমর্থনের বার্তা দেয়।

এই আন্দোলনের পটভূমিতে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ। নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী দশ মাসে অন্তত চোদ্দো বার ভোটার তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এর পরেই কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা ও যৌথ দায়িত্ব নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়। কমিশন অবশ্য জানিয়েছে, এসআইআর-সহ সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছিল।

ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিয়ে এই বিরোধের কেন্দ্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: সংশোধনের সময় কোনও যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়লে তাঁর অধিকার কীভাবে রক্ষা হবে? আন্দোলনকারীদের দাবি, তালিকা সংশোধনের যুক্তি দেখিয়ে নাগরিককে ভোটের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা চলবে না; অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।

দীপকে দীর্ঘ আন্দোলনের প্রস্তুতির কথাও জানান। তাঁর বক্তব্য, প্রয়োজন হলে তিন দিনের বদলে তিন মাস প্রতিবাদ চালাবেন তাঁরা। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীসের উদ্দেশেও তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। অন্যদিকে ফডণবীস নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলিকে ভিত্তিহীন রাজনৈতিক প্রচার বলে খারিজ করেছেন। ফলে এসআইআর নিয়ে বিরোধ এখন কমিশনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সীমা ছাড়িয়ে প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ নিচ্ছে।

মুম্বইয়ের এই জমায়েতের বিশেষ তাৎপর্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো সাধারণত প্রশাসনিক পরিসরে থাকা একটি বিষয়কে ঘিরে তরুণ, শিল্পী ও সাধারণ নাগরিকেরা একই প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন। তাঁদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে ভোট দিতে পারার নিশ্চয়তা এবং নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা। জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের প্রশ্ন পৃথক হলেও, সেই আস্থার সংকট যে রাজপথে প্রতিবাদের বিষয় হয়ে উঠেছে, শিবাজি পার্কের জমায়েত তারই প্রকাশ।