আমেরিকার টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরেও বেঁচে রইলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি ক্রিস্টা পাইক। বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাতে এই ঘটনা ঘটে। ৫০ বছর বয়সি পাইককে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখতে হয়েছে। ঘটনার পরে টেনেসির গভর্নর বিল লি বছরের বাকি সময়ের জন্য সমস্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

এই ঘটনা প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নিয়মবিধি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রধান পদ্ধতি এটিই।

১৯ বছরের তরুণী কলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে ১৯৯৬ সালে পাইক দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়। অপরাধের সময় তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর।

অপরাধ করার সময় পাইক কিশোরী ছিলেন বলে মামলাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক হয়। তাঁর সমর্থকেরা যুক্তি দেন, তাঁর মানসিক অসুস্থতা এবং শৈশবে নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়গুলি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

বুধবার রাতে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। সাজা ঘোষণার সময় তাঁর শৈশবের নির্যাতনের অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি—এই অভিযোগের ভিত্তিতে একটি ফেডারেল আপিল আদালত শেষ মুহূর্তে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই স্থগিতাদেশ খারিজ করে দেয়। পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে, দু’শো বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে টেনেসিতে এই প্রথম কোনও নারীর প্রাণদণ্ড কার্যকর হত।

পাইককে পেন্টোবারবিটাল নামে একটি ওষুধের দু’টি ডোজ দেওয়া হয়। আমেরিকায় প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার একাধিক পদ্ধতিতে এই ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

চিকিৎসকেরা খিঁচুনির চিকিৎসায় পেন্টোবারবিটাল ব্যবহার করে থাকেন। এটি শরীরের কার্যকলাপ, বিশেষত মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের কাজ ধীর করে দেয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে এই ওষুধ কখনও অন্য ওষুধের সঙ্গে, কখনও এককভাবে ব্যবহার করা হয়।

টেনেসির ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশনে উপস্থিত সাক্ষীরা সংবাদমাধ্যমকে জানান, ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরেও পাইকের হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়নি। ওষুধের ডোজ দেওয়ার পরে তাঁর নাক ডাকার শব্দও শোনা যায়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কক্ষের পর্দা বারবার টেনে দেওয়া হচ্ছিল। ফলে সাক্ষীরা অনেক সময় কেবল শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন।

জানা গিয়েছে, প্রক্রিয়া চলাকালীন পাইক কয়েক বার কথাও বলেন। এক ঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরে সাক্ষীদের কারাগার থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তখনও তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরে তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে।

কেন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা গেল না, সে বিষয়ে টেনেসির কর্তৃপক্ষ কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি।

পাইকের আইনজীবীরা ঘটনার আরও বিবরণ দিয়ে জানান, তাঁর শিরায় ওষুধ দেওয়ার জন্য আইভি লাইন বসাতে কর্তৃপক্ষ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করে। বাহুতে শিরা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টায় অন্তত সাতটি সুচ ব্যবহার করা হয়। আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, পাইক নিজেই বাহুর একটু উপরের দিকে শিরা খোঁজার পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রক্রিয়া চলাকালীন তিনি এ-ও জিজ্ঞাসা করেন, তাঁর বাহুতে যে অনুভূতি হচ্ছে, তা কি হওয়ার কথা?

এক বিবৃতিতে তাঁর আইনজীবীরা বলেন, “আজ রাতে টেনেসি রাজ্য আবারও আইনসম্মতভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে ব্যর্থ হল। আমাদের আশঙ্কা সত্যি হওয়ায় আমরা কোনও আনন্দ পাচ্ছি না। কিন্তু পাইক যে উদ্বেগগুলি জানিয়েছিলেন, সেগুলিই সত্যি হয়েছে—শিরায় প্রবেশের অসুবিধা, শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ওষুধ বাইরে বেরিয়ে যাওয়া, গুণমান নষ্ট হয়ে যাওয়া পেন্টোবারবিটাল, এবং অনিবার্যভাবে পরিস্থিতি বিপর্যস্ত হওয়ার সময় জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকা। এই সবই ঘটেছে এমন এক নিয়মবিধির অধীনে, যা এখনও গোপনীয়তার আড়ালে ঢাকা।”

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ, ওষুধ হয়তো তাঁর রক্তপ্রবাহে প্রবেশই করেনি; পরিবর্তে তা শিরার বাইরে আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁদের মতে, পাইকের মৃত্যু না হলেও ওষুধের প্রভাবে তাঁর শরীরে স্থায়ী ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে।

পাইকের আইনজীবীরা আগেই আশঙ্কা জানিয়েছিলেন, তাঁর সরু শিরা এবং একটি রক্তের অসুখের কারণে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে। ওই অসুখের জন্য তাঁর শিরায় সুচ ঢোকানো কঠিন বলে তাঁরা জানিয়েছিলেন।

তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় নিজেদের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে টেনেসির কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, “অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর অনুমোদিত রাজ্যের আইনসম্মত ও প্রতিষ্ঠিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নিয়মবিধির প্রতিটি ধাপ” অনুসরণ করা হয়েছে।

দ্য টেনেসিয়ান সংবাদপত্রকে কর্তৃপক্ষ জানায়, “এই নিয়মবিধিতে নির্ধারিত প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনের রাসায়নিকটি ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হয়েছে। আজ সন্ধ্যায় যা করা হয়েছে, তার বাইরে অতিরিক্ত কোনও প্রক্রিয়া অনুসরণের অনুমতি এই নিয়মবিধি দেয় না।”

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার এই ব্যর্থ প্রচেষ্টাকে “গভীরভাবে উদ্বেগজনক” বলে বর্ণনা করেছেন গভর্নর। বছরের বাকি সময়ের জন্য সমস্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা স্থগিত রাখার পাশাপাশি, তিনি ঘটনার তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পর্যালোচনার ঘোষণা করেছেন।

অন্য দিকে, পাইকের আইনজীবীরা তাঁর মৃত্যুদণ্ড লঘু করে অন্য সাজা দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। হাসপাতালে তাঁর অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক।

২০২৬ সালে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়া পরিকল্পনামতো এগোল না। এর আগে, চলতি বছরের গোড়ায় টনি ক্যারাদার্সের শরীরে প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন দেওয়ার জন্য শিরা খুঁজে পেতে কর্মীদের অসুবিধা হওয়ায় তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা বাতিল করতে হয়। পরে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এক বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়।

মৃত্যুদণ্ড-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করা আমেরিকার অলাভজনক সংস্থা ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টার জানিয়েছে, শিরায় আইভি লাইন বসানো না যাওয়ায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এবং দণ্ডিত ব্যক্তি বেঁচে গিয়েছেন—এমন সাত জনের ঘটনা তারা নথিভুক্ত করেছে। তবে সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ওষুধের প্রাণঘাতী মাত্রা ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে দেওয়ার পরেও বেঁচে যাওয়া প্রথম ব্যক্তি পাইক।

সংস্থার নির্বাহী পরিচালক রবিন এম. মাহের বলেন, “আমরা যত ব্যর্থ প্রচেষ্টা দেখেছি, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ। আধুনিক যুগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অন্য কোনও ব্যর্থ ঘটনার সঙ্গে এর তুলনা চলে না।”