বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল এখন আমেরিকায়, জি২০ বাণিজ্যমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে মার্কিন সমপক্ষের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নিয়ে কথা বলছেন। ঠিক এই সময়েই ভারতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সকলের জন্য সমান সুযোগের পক্ষে সওয়াল করল মার্কিন বিদেশ দফতরের একটি রিপোর্ট। দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কথা ফের তুলে ধরে সেখানে জানানো হয়েছে, ভারতে এমন কিছু আইন ও রীতিনীতি বহাল রয়েছে, যা বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগের সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করে।

মার্কিন বিদেশ দফতরের মূল্যায়ন: “ভারত অধিকাংশ ক্ষেত্রে আগাম অনুমোদন ছাড়াই ১০০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি দেয়। কিন্তু বহু ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রির খুচরো ব্যবসা, বেসরকারি ব্যাঙ্কিং, ওষুধশিল্প, প্রতিরক্ষা, মুদ্রিত ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম এবং কৃত্রিম উপগ্রহের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সরকারি অনুমোদন চাইতে হয়। এর মধ্যে এমন সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন সহযোগী সংস্থাও রয়েছে, যেগুলি ভারতে নিবন্ধিত, ভারতে কর দেয় এবং ভারতীয় কর্মী নিয়োগ করে।”

মার্কিন ব্যবসায়িক সংস্থাগুলির অভিযোগ, বাস্তবে দুর্নীতির মুখোমুখি হওয়া এবং সম্ভাব্য দুর্নীতির আশঙ্কা, বিশেষত নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায়, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে আমেরিকার মোট প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের সঞ্চিত পরিমাণ ছিল ৫৮.৫৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৩.৩৭ শতাংশ কম।

দুর্বল বিনিয়োগ ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে বড় উদ্বেগের বিষয়। তবে পরিসংখ্যানে অন্য ছবিও ফুটে উঠছে: জুলাই মাসে ভারতে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুক্রবার গভীর রাতে প্রকাশিত রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য বলছে, নিট এফডিআই বেড়ে ৭.৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা পাঁচ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২১ সালের মে মাসে ৮.৮০ বিলিয়ন ডলার প্রবাহের পর এটিই সর্বোচ্চ মাসিক অঙ্ক।

ফরেন এক্সচেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট বা ফেমা নিয়ে মার্কিন বিদেশ দফতরের আপত্তি আলাদা। তাদের মতে, এই আইন একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এবং বিদেশি পোর্টফোলিয়ো বিনিয়োগ বা এফপিআই করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে, ফলে একটি অপ্রয়োজনীয় এবং ব্যতিক্রমীভাবে বোঝা চাপানো বাধা তৈরি হয়েছে। কোনও বিনিয়োগ গোষ্ঠীর একটি তহবিলের কাছে কোনও সংস্থার আইপিও-পূর্ব এফডিআই অংশীদারি থাকলে, একই গোষ্ঠীর অন্য স্বাধীন তহবিলগুলিও সেই সংস্থার প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওতে অংশ নিতে পারে না। দফতরের যুক্তি, এফপিআইয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১০ শতাংশ সীমাই সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট, তাই এই বাড়তি বিধিনিষেধ অপ্রয়োজনীয়। অন্য কোনও বড় অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় এর সমতুল্য বাধা নেই।

বর্তমান নিয়মে কোনও বিনিয়োগকারী একটি সংস্থার আইপিওর আগে এফডিআইয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগ করলে, আইপিও-পূর্ব এফডিআই শেয়ার সম্পূর্ণ বিক্রি না করা পর্যন্ত তিনি আইপিও চলাকালীন বা তার পরে এফপিআইয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত শেয়ার কিনতে পারেন না। আইপিওর পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শেয়ার বিক্রি নিষিদ্ধ থাকার নিয়মের কারণে এই প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হয়।

এই প্রসঙ্গে মার্কিন বিদেশ দফতরের বক্তব্য: “একাধিক স্বাধীন ইকুইটি তহবিল পরিচালনাকারী বড় বিনিয়োগ গোষ্ঠীগুলির জন্য এই বিধিনিষেধ বিশেষভাবে সমস্যাজনক। কারণ, একটি তহবিল আইপিওর আগে বিনিয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলে একই গোষ্ঠীর অন্য তহবিলগুলির আইপিওতে অংশগ্রহণ কার্যত আটকে যেতে পারে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এফপিআইয়ের বিদ্যমান ১০ শতাংশ সীমা ইতিমধ্যেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভারতীয় তালিকাভুক্ত সংস্থায় কৌশলগত অংশীদারি অর্জনের সুযোগ সীমিত করে। ফলে বিদেশি মালিকানা কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকানোর সুরক্ষা হিসেবে একই সঙ্গে এফডিআই ও এফপিআইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞাটি অপ্রয়োজনীয়।”

আমদানি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে মার্কিন বিদেশ দফতর। ২০২৩ সালে চালু হওয়া এবং ধাপে ধাপে আমদানির সীমা নির্ধারণ করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সম্প্রসারিত ভারতের ইমপোর্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা আইএমএস বিদেশি সংস্থাগুলির জন্য সমস্যা তৈরি করে চলেছে। বিশেষ কাজে ব্যবহৃত পুরনো যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভার, সেমিকন্ডাক্টর এবং প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত জরুরি উন্নত পরীক্ষণ সরঞ্জাম। দফতরের দাবি, অনুমোদন পাওয়ার জটিল শর্ত এবং স্বচ্ছ নির্দেশিকার অভাব নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

রফতানির ক্ষেত্রে ভারত সংবেদনশীল পণ্য নিয়ন্ত্রণ করে ‘স্কোমেট’ তালিকার মাধ্যমে। এই তালিকায় রয়েছে বিশেষ রাসায়নিক, জীব, উপাদান, সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তি। এর দায়িত্বে রয়েছে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড বা ডিজিএফটি।

ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাঙ্কগুলির কার্যকর করের হার ৩৮.২২ শতাংশ, যা দেশীয় ব্যাঙ্কগুলির তুলনায় ৪.৬৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। এর প্রভাব নিয়ে সতর্ক করে মার্কিন বিদেশ দফতর লিখেছে, “এই বাড়তি কার্যকর করের বোঝা বিদেশি ঋণদাতা সংস্থাগুলির কাছে বাজার হিসেবে ভারতের আপেক্ষিক আকর্ষণকে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফলে মূলধন বরাদ্দ, পরিষেবার মূল্য নির্ধারণ এবং ভারতে তাদের কার্যক্রমের পরিসর সংক্রান্ত সিদ্ধান্তেও প্রভাব পড়তে পারে।”

যদিও ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বড় আন্তর্জাতিক ও মার্কিন ব্যাঙ্কগুলির সঙ্গে ভারতের করেসপন্ডেন্ট ব্যাঙ্কিং বা পারস্পরিক ব্যাঙ্কিং পরিষেবার যোগাযোগ স্থিতিশীল। ব্যাঙ্কিং এবং পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে ভারত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি বাজার। এই নিয়ন্ত্রণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যক্রম ও মার্কিন করেসপন্ডেন্ট ব্যাঙ্কগুলির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে সহায়তা করে।

তবে ঝুঁকির কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে দফতর: “একই সঙ্গে ভারতে উদীয়মান অর্থনীতির পরিচিত কিছু ঝুঁকি এখনও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় পরিবর্তন, সামষ্টিক অর্থনীতির ওঠানামা এবং সমস্যায় পড়া ব্যাঙ্কগুলির বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নিয়মে পরিবর্তন। ভারতীয় ব্যাঙ্কগুলির সঙ্গে করেসপন্ডেন্ট ব্যাঙ্কিং সম্পর্ক বজায় রাখা বা সেই সম্পর্কের মূল্যায়নের সময় মার্কিন ব্যাঙ্কগুলির কাছে এগুলি প্রাসঙ্গিক বিবেচ্য বিষয়।”

বিদেশিরা ভারতে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন। তবে তাঁদের আবাসিক মর্যাদা এবং ভারতে থাকার উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক শর্ত ও বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হয়, উল্লেখ করেছে মার্কিন বিদেশ দফতর।

দুর্নীতির প্রসঙ্গে দফতরের মূল্যায়ন, ২০১৩ সালের কোম্পানি আইন কর্পোরেট পরিচালনব্যবস্থা ও নজরদারির এমন কিছু শর্ত নির্ধারণ করেছে, যা বেসরকারি ক্ষেত্রে দুর্নীতিবিরোধী নিয়ম মেনে চলার সহায়ক। অনিয়ম প্রকাশকারীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা, শিল্পক্ষেত্রের আচরণবিধি এবং সংস্থার পরিচালন পর্ষদে স্বাধীন ডিরেক্টর নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে এই কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।

রিপোর্টের ভাষায়: “এই কাঠামোর আওতায় সরকার বেসরকারি সংস্থাগুলিকে এমন অভ্যন্তরীণ আচরণবিধি তৈরি করতে উৎসাহ দেয়, যা সরকারি আধিকারিকদের ঘুষ দেওয়া নিষিদ্ধ করে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলিকে বিশেষভাবে ডিরেক্টর এবং শীর্ষ পরিচালনকর্তাদের জন্য আচরণবিধি গ্রহণ করতে হয়। তবে বেসরকারি ক্ষেত্রজুড়ে এই অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ম মেনে চলার ব্যবস্থাগুলি কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য সীমিত।”