ককপিটে ছুরিকাহত ভারতীয় পাইলট স্মিত, এগারো বছর ছিলেন স্পাইসজেটে

যা জানা জরুরি
- দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে মাঝআকাশে ছুরিকাহত প্রধান পাইলট ভারতীয় নাগরিক স্মিত মাচ্ছার।
- বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনায় তাঁর পরিচয় সামনে আসার পরে জানা গিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বিমান সংস্থাটিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি এগারো বছর স্পাইসজেটে…
- বিভিন্ন সুত্র অনুযায়ী, সহ-পাইলটের হামলার মুখেও বিমানটিকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে মাঝআকাশে ছুরিকাহত প্রধান পাইলট ভারতীয় নাগরিক স্মিত মাচ্ছার। বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনায় তাঁর পরিচয় সামনে আসার পরে জানা গিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বিমান সংস্থাটিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি এগারো বছর স্পাইসজেটে কাজ করেছেন। বিভিন্ন সুত্র অনুযায়ী, সহ-পাইলটের হামলার মুখেও বিমানটিকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি। ককপিটে সংঘর্ষের পরে ১৭৪ জন যাত্রীকে নিয়ে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুকে নিরাপদে অবতরণ করে।
কে এই স্মিত মাচ্ছার
মাচ্ছারের লিঙ্কডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০১১ সালের জুনে স্পাইসজেটেই তাঁর পেশাদার উড়ানজীবন শুরু হয়। ২০২২ সালের জুনে তিনি ক্যাপ্টেন হিসেবে ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন। তাঁর কর্মস্থল দুবাই। তার আগে মুম্বইয়ে স্পাইসজেটের সিনিয়র কম্যান্ডার এবং লাইন ট্রেনিং ক্যাপ্টেন ছিলেন তিনি। এই পদে নিয়মিত বাণিজ্যিক উড়ান পরিচালনার মধ্যেই অন্য পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অন্য পাইলটদের কাজের মান যাচাই এবং বিমান পরিচালনার বিভিন্ন দায়িত্বও সামলেছেন তিনি।
লিঙ্কডইন প্রোফাইলে তাঁর মোট উড়ানের অভিজ্ঞতা ৯,৭৫০ ঘণ্টা বলে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ৬,৪০০ ঘণ্টার বেশি তিনি প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত পাইলট হিসেবে বিমান চালিয়েছেন। বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এবং ৭৩৭ ম্যাক্সের বিভিন্ন সংস্করণ পরিচালনায় অভিজ্ঞ তিনি; তাঁর কর্মজীবন মূলত যাত্রীবাহী বিমান চলাচলকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে।
নিজের পরিচিতিতে মাচ্ছার লিখেছেন, “বোয়িং ৭৩৭ বহরে ১৩ বছরের বেশি বাণিজ্যিক উড়ানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এয়ারলাইন ক্যাপ্টেন। এর মধ্যে দীর্ঘ সময় লাইন ট্রেনিং ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করেছি। পাইলটদের প্রশিক্ষণ, দিশা দেওয়া এবং তাঁদের দক্ষতা মূল্যায়নে অভিজ্ঞ। নিরাপত্তা, বিধি মেনে চলা ও উড়ান পরিচালনায় উৎকর্ষকে বিশেষ গুরুত্ব দিই। বর্তমানে ফ্লাইদুবাইয়ে ডাইরেক্ট এন্ট্রি ক্যাপ্টেন হিসেবে কর্মরত। প্রশিক্ষক দলে আরও বেশি অবদান রাখতে আগ্রহী।”
ককপিটে কী ঘটেছিল
ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ উড়ানে সহ-পাইলট ছুরি নিয়ে হামলা চালান বলে ইজরায়েলি সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। একাধিক সংবাদমাধ্যম অভিযুক্তকে ওমানের নাগরিক বলে উল্লেখ করেছে। ওই প্রতিবেদনগুলিতে দাবি করা হয়েছে, বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে সেটিকে বিধ্বস্ত করার উদ্দেশ্যেই এই হামলা। তবে সংবাদমাধ্যমগুলি পাইলট বা সহ-পাইলটের নাম প্রকাশ করেনি। প্রথম দিকের খবরগুলিতে ঘটনাটিকে দুই পাইলটের সংঘর্ষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
সংঘর্ষের সময় বিমানটি আচমকা দ্রুত উচ্চতা হারায়। প্রকাশিত উড়ানতথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিরিশ সেকেন্ডে সেটি চোদ্দো হাজার ফুটের কাছাকাছি নেমে আসে। জর্ডনের কাছে বিমানটি জরুরি পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য বিমান ছিনতাইয়ের সতর্কসংকেত পাঠায়; এর মধ্যে বেআইনি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা বোঝানো সংকেতও ছিল। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ইজরায়েল যুদ্ধবিমান ওড়ায়। শেষ পর্যন্ত গতিপথ বদলে উড়ানটিকে তাবুকের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। হামলায় ঠিক কী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল এবং হামলাকারী কীভাবে সেটি বিমানে নিয়ে এসেছিলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণে এল পরিস্থিতি
ইজরায়েলের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বিমান বিধ্বস্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে ক্যাপ্টেন সহ-পাইলটকে প্রতিরোধ করেন। পরে বিমানকর্মী ও কয়েকজন যাত্রী মিলে সহ-পাইলটকে কাবু করেন। ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মুখপাত্র জানিয়েছেন, আহত ক্যাপ্টেন ককপিটের দরজা খুলে দেওয়ায় যাত্রীরা ভিতরে ঢুকে হামলাকারীকে কাবু করার সুযোগ পান। ফ্লাইদুবাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বিমানে থাকা অতিরিক্ত পাইলটদল পরে নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং নিরাপদে অবতরণ করায়। ককপিটের সংঘর্ষে দুই পাইলটই আহত হন।
ফ্লাইদুবাইয়ের এক মুখপাত্র বলেন, “ওই উড়ানে থাকা কর্তব্যরত ফ্লাইদুবাই কর্মীরা সফলভাবে বিমানটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তাঁরা গতিপথ পরিবর্তন করে বিমানটিকে তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করান। সমস্ত যাত্রী ও বিমানকর্মী নিরাপদে রয়েছেন এবং প্রত্যেকের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে।”
চিকিৎসা ও সরকারি যোগাযোগ
আহত ভারতীয় পাইলটকে সৌদি আরবের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পরে তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল। তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে ফ্লাইদুবাই এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও সৌদি আরবের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আই২৪নিউজের খবর অনুযায়ী, ঘটনার পর প্রথমে সৌদি আরবে উপস্থিত ইজরায়েলি আধিকারিকেরা আহত ক্যাপ্টেনকে আমিরশাহির নাগরিক বলে মনে করেছিলেন; পরে তাঁর ভারতীয় পরিচয় জানা যায়।
বিমান সংস্থা ককপিটের ভয়েস রেকর্ডারের তথ্য খতিয়ে দেখে বিবৃতি দেওয়ার কথা জানিয়েছে। দুই পাইলটের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল এবং সেই মুহূর্তে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কী ঘটছিল, তা বোঝার ক্ষেত্রে ওই রেকর্ড গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই সন্ত্রাসবাদী হামলার অভিযোগ এবং তদন্তে প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



