লকাতা পুরসভা ৯১৯টি হোটেল, লজ ও অতিথিশালাকে অস্থায়ীভাবে বন্ধের নোটিস দিয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুরসভা, দমকল ও কলকাতা পুলিশের যৌথ দল ৯৬০টি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা করে মাত্র ৪১টিকে অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম মেনে চলতে দেখেছে। অর্থাৎ পরিদর্শিত প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৬ শতাংশেই ঘাটতি পাওয়া গেছে। ১৯ অগস্ট মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন-এ আগুনে নয়জনের মৃত্যুর পরে এই অভিযান শুরু হয়; নিহতদের সাতজন বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন।

পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে বলেছেন, অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে আপস হবে না। যে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ঠিক করবে, নতুন করে পরিদর্শন ও দ্রুত লাইসেন্সের আবেদন করতে পারবে। কিন্তু আবাসিক বাড়িকে অনুমতি ছাড়া ঘর ভাগ করে অতিথিশালায় বদলানো হলে শুধু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বসিয়ে বৈধতা মিলবে না; ভবনের ব্যবহারের চরিত্র বদলের অনুমোদনও প্রয়োজন। এ পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরু সিঁড়ি, বন্ধ জানালা বা একটিমাত্র বেরোনোর পথ পরে সহজে সংশোধন করা যায় না।

শহরে পুরসভার দেওয়া লাইসেন্স তিন হাজারের বেশি এবং মোট হোটেল–অতিথিশালার সংখ্যা আনুমানিক ৩,৭০০। তাই ৯৬০টির পরীক্ষা পুরো বাজারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ৯১৯টি নোটিসকে চূড়ান্ত রাজ্যব্যাপী হিসাব বলা যাবে না; বাকি প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা চলবে। একই সময়ে দমকল দপ্তর বড় বিপণিবিতানেও নির্গমনপথ, শংসাপত্র ও প্রস্তুতি যাচাই করছে। দুর্গাপুজোর আগে দর্শনার্থী বাড়ায় সময়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

‘অগ্নিনিরাপত্তা নেই’ কথাটিও ভেঙে প্রকাশ করা দরকার। কোনও প্রতিষ্ঠানে মেয়াদোত্তীর্ণ শংসাপত্র, কোথাও পর্যাপ্ত সিঁড়ি নেই, কোথাও ধোঁয়া শনাক্তকারী, জলাধার বা জরুরি আলো অনুপস্থিত হতে পারে। ঝুঁকির মাত্রা এক নয়। পুরসভা যদি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ত্রুটি, নোটিসের তারিখ এবং পুনরায় খোলার অবস্থা অনলাইনে প্রকাশ করে, অতিথি বুকিংয়ের আগে যাচাই করতে পারবেন এবং মালিকও একই মানদণ্ড পাবেন।

বন্ধের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রভাবও আছে। স্বল্পমূল্যের অতিথিশালা চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ ও জেলা থেকে আসা মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী পর্যটকের প্রধান ভরসা। দ্রুত বিপুল শয্যা বন্ধ হলে ভাড়া বাড়তে পারে এবং অনিবন্ধিত আবাসনের দিকে মানুষ ঠেলে যেতে পারেন। নিরাপত্তার নামে নোটিস প্রত্যাহার করা সমাধান নয়; স্বচ্ছ সময়বদ্ধ সংশোধন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনকে আগে বন্ধ রাখা দরকার।

কর্মীদের নিরাপত্তাও অতিথির মতো গুরুত্বপূর্ণ। রাতের পালায় কতজন থাকবেন, অ্যালার্ম শুনে কে বিদ্যুৎ বন্ধ করবেন, রান্নাঘরের গ্যাস কোথায়, প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ অতিথিকে কীভাবে নামানো হবে—অনুশীলন ছাড়া যন্ত্র কাজে আসে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দৃশ্যমান সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা, দু’টি নির্গমনপথের মানচিত্র এবং সাম্প্রতিক মহড়ার তারিখ থাকা উচিত।

পুরসভার নিজের অনুমোদন-পদ্ধতিও পর্যালোচনার দাবি রাখে। লাইসেন্স থাকলেও আগুনের শংসাপত্র কেন ছিল না, কিংবা মেয়াদ ফুরোনোর পরে ব্যবসা কীভাবে চলল—এ প্রশ্ন শুধু মালিককে নয়, অনুমোদনদাতা দপ্তরকেও করতে হবে। ডিজিটাল ব্যবস্থায় এক শংসাপত্র মেয়াদোত্তীর্ণ হলে অন্য লাইসেন্সের নবীকরণ আটকে এবং পরিদর্শকের কাছে স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা যেতে পারে। পরিদর্শনের ছবি ও সময়-চিহ্ন সংরক্ষণ করলে কাগজে পরীক্ষা দেখানোর সুযোগ কমে।

অতিথিরও কয়েকটি সহজ অধিকার থাকা উচিত: বুকিংয়ের আগে বৈধ অগ্নিশংসাপত্র দেখা, জরুরি পথ বন্ধ থাকলে অভিযোগ করা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাতিল করলে টাকা ফেরত পাওয়া। অনলাইন ভ্রমণমঞ্চগুলি লাইসেন্স নম্বর যাচাই না করে ঘর তালিকাভুক্ত করলে তারাও ঝুঁকির বাজার তৈরি করে। পুরসভা প্ল্যাটফর্মগুলিকে নিয়মিত বৈধ তালিকা দিলে বন্ধ প্রতিষ্ঠান নতুন নামে বুকিং নেওয়া কঠিন হবে।

৯১৯টি নোটিস কঠোরতার ছবি, কিন্তু প্রয়োগের সাফল্য নয়। কতটি সত্যিই বন্ধ হল, কতটি কী সংশোধন করে খুলল এবং কতটির মামলা ঝুলল—মাসিক হিসাব ছাড়া অভিযান উৎসবের পরে থেমে যেতে পারে। লাইসেন্স, ভবন-ব্যবহার ও অগ্নিশংসাপত্র তিনটি আলাদা দপ্তরে থাকলে ফাঁক তৈরি হয়; একটি সমন্বিত জনতালিকা দরকার। শিখা ইন-এর নয়টি মৃত্যু তখনই শিক্ষা হবে, যখন অতিথিকে দরজায় গিয়ে নিরাপত্তার সত্যতা আন্দাজ করতে হবে না।