ভারতের পণ্যে ১০০ শতাংশ শুল্কের প্রস্তাব, মার্কিন হাউসে এগোল রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা বিল

যা জানা জরুরি
- রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কেনার জন্য ভারতসহ বিভিন্ন দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দিতে আরও এক…
- মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, সংশ্লিষ্ট বিল এবং আরও কয়েকটি আইনপ্রস্তাব আলোচনায় আনার প্রস্তাব ২১৪–২১১ ভোটে গৃহীত হয়েছে।
- বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিলটির চূড়ান্ত ভোটাভুটি হওয়ার কথা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কেনার জন্য ভারতসহ বিভিন্ন দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দিতে আরও এক ধাপ এগোল প্রতিনিধি পরিষদ। মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, সংশ্লিষ্ট বিল এবং আরও কয়েকটি আইনপ্রস্তাব আলোচনায় আনার প্রস্তাব ২১৪–২১১ ভোটে গৃহীত হয়েছে। বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিলটির চূড়ান্ত ভোটাভুটি হওয়ার কথা।
মাত্র তিন ভোটের ব্যবধানে এই সিদ্ধান্ত ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বকে অপ্রস্তুত করেছে। দুই ডেমোক্র্যাট সদস্য রিপাবলিকানদের সঙ্গে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমের খবর। তবে এই ভোটের অর্থ বিলটি চূড়ান্তভাবে পাশ হয়ে যাওয়া নয়। ভারতের পণ্যে নতুন শুল্কও কার্যকর হয়নি। আপাতত বিলটি প্রতিনিধি পরিষদের চূড়ান্ত বিবেচনার জন্য এগিয়েছে; পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে শুল্কের হুমকি বাস্তব হবে কি না।
বিলটির নাম ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’। প্রয়াত রিপাবলিকান সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন। গত ৭ অগস্ট সেনেটে ৮৬–১১ ভোটে বিলটি অনুমোদিত হয়। সেখানে দুই দলের ব্যাপক সমর্থন মিললেও প্রতিনিধি পরিষদে একই ঐকমত্য তৈরি হয়নি। রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে কতটা ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়েই বিরোধ।
ওয়াশিংটনের যুক্তি, রাশিয়ার তেল ও গ্যাস বিক্রির আয় ইউক্রেনে যুদ্ধ চালানোর অর্থ জোগাচ্ছে। তাই মস্কোর ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে তার জ্বালানির বড় ক্রেতাদের ওপরও চাপ তৈরি করতে হবে। বিলটিতে রুশ ক্ষমতাবৃত্তের প্রভাবশালী ব্যক্তি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহণে ব্যবহৃত জাহাজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাকে নিশানা করা হয়েছে। ইরানের জ্বালানি ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তির মেয়াদ বাড়ানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।
ভারতের উদ্বেগের কেন্দ্রে তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের বিধান। সেনেটে অনুমোদিত বয়ানে রুশ তেল ও গ্যাসের পাঁচ বৃহত্তম ক্রেতার দেশ থেকে আমেরিকায় আমদানি করা পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানোর ক্ষমতা দেওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ, বিষয়টি ভারতের বন্দরে আসা রুশ তেলের ওপর মার্কিন কর নয়; রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যের কারণে আমেরিকার বাজারে সংশ্লিষ্ট দেশের রফতানিকে শাস্তির মুখে ফেলার প্রস্তাব।
সহজ হিসাবে, ১০০ ডলার মূল্যের কোনও পণ্য এই হারে শুল্কের আওতায় পড়লে শুধু ওই শুল্ক বাবদ আরও ১০০ ডলার দিতে হবে। এটি একটি উদাহরণ; আমেরিকার বাজারে সংশ্লিষ্ট দোকানের চূড়ান্ত দাম ঠিক দ্বিগুণ হবে, এমন নয়। পরিবহণ, অন্যান্য কর, ব্যবসায়ীর মুনাফা এবং বাড়তি খরচের কতটা ক্রেতার ওপর চাপানো হচ্ছে, তার ওপর বাজারদর নির্ভর করবে।
ভারতের নাম সরাসরি যুক্ত করার একটি সংশোধনীও জমা পড়েছিল। ডেমোক্র্যাট সদস্য স্টেনি হোয়ারের সেই প্রস্তাবে ভারত, চিন, তুরস্ক, আজারবাইজান, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সিঙ্গাপুর, কাজাখস্তান ও কিরঘিজস্তানের উল্লেখ ছিল। সেনেটের অনুমোদিত বয়ানে দেশের নামের পরিবর্তে বৃহৎ আমদানিকারকের সাধারণ সংজ্ঞা ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে ভারতকে নাম ধরে চিহ্নিত করা এবং আমদানির মাপকাঠিতে সম্ভাব্য শুল্কের আওতায় পড়া—দুটি পৃথক বিষয়।
তবে প্রতিনিধি পরিষদের বিধিবিষয়ক কমিটির নথি অনুযায়ী, হোয়ারের সংশোধনীটি সভায় বিবেচনার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব ৩–৭ ভোটে পরাজিত হয়েছে। তাই দশ দেশের নামসংবলিত সংশোধনীকে অনুমোদিত বিলের অংশ বলে বর্ণনা করা ঠিক হবে না। একইভাবে, প্রেসিডেন্টকে এই শুল্কক্ষমতা দেওয়ার ধারাটি বাদ দেওয়ার ডেমোক্র্যাট প্রস্তাব আলোচনার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগও কমিটিতে ৩–৭ ভোটে হেরে গিয়েছে।
শুল্কের ধারাটি বাদ দেওয়ার সংশোধনী এনেছিলেন ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিকস। তাঁর শিবিরের আপত্তি, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আড়ালে প্রেসিডেন্টকে ব্যাপক বাণিজ্যিক ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। অন্য একটি প্রস্তাবে মিকস ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও পরিষেবার জন্য ১,৫০০ কোটি ডলারের সহায়তার ব্যবস্থা চেয়েছেন। অর্থাৎ, বিরোধের রেখাটি শুধু ইউক্রেনকে সাহায্য করা বা না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সাহায্যের পদ্ধতি নিয়েও মতভেদ রয়েছে।
বিলটির বিরোধীদের আশঙ্কা, ট্রাম্প নতুন ক্ষমতা ব্যবহার করে মিত্রদেশগুলিকেও চাপে ফেলতে পারেন। বাড়তি শুল্কের খরচ শেষ পর্যন্ত আমেরিকার আমদানিকারক ও সাধারণ ক্রেতার ঘাড়ে পড়ার উদ্বেগও রয়েছে। আবার প্রেসিডেন্টকে নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ রাখায় প্রশ্ন উঠেছে, কঠোর ব্যবস্থা ঘোষণার পরও তার প্রয়োগ কতটা নিশ্চিত থাকবে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কিছু রিপাবলিকান সদস্যের মধ্যেও বিলের বিভিন্ন বিধান নিয়ে সংশয় রয়েছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দ্রুত বিলটি পাশ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর সরকারের কাছে রাশিয়ার আয়ের উৎসে চাপ বাড়ানো যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মার্কিন কংগ্রেসের আসন্ন বিরতি এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতির কারণে সময়ও একটি বড় বিষয়। বিলের সমর্থকেরা চান, আইনপ্রণেতারা নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত হয়ে পড়ার আগেই সিদ্ধান্ত হোক; প্রতিনিধি পরিষদের মতভেদ সেই তাড়াহুড়োয় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রস্তাবটির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ফল বিচার করলে ভারতের সামনে দুটি চাপ স্পষ্ট হয়। রুশ তেল কেনা কমালে বিকল্প সরবরাহের দাম ও প্রাপ্যতা বিবেচনা করতে হবে। আবার কেনা চালিয়ে যাওয়ার জেরে মার্কিন শুল্ক কার্যকর হলে আমেরিকায় ভারতীয় পণ্য বিক্রির প্রতিযোগিতায় আঘাত আসতে পারে। তবে কোন পণ্য কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা এখনই নিশ্চিত বলা যায় না। চূড়ান্ত আইনি বয়ান, ছাড়ের ব্যবস্থা এবং প্রয়োগের সিদ্ধান্তই তা নির্ধারণ করবে।
এখন নজর ১৬ সেপ্টেম্বরের ভোটে। সেনেটের অনুমোদিত বয়ান অপরিবর্তিত রেখে প্রতিনিধি পরিষদ সম্মতি দিলে বিলটি প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য এগোতে পারবে। কিন্তু আইন করার ক্ষমতা দেওয়া এবং নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করা এক ঘটনা নয়। ভারতের জন্য আপাতত তাৎপর্য এই যে, রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যকে মার্কিন বাজারে প্রবেশের শর্তের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় বাধা পেরিয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



