বিচারবিভাগীয় সদস্য ছাড়াই কি ইডির সম্পত্তি আটকের নির্দেশ অনুমোদন করা যায়? বেআইনি অর্থ লেনদেন প্রতিরোধ আইনে গঠিত নির্ণায়ক কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা ও কাঠামো নিয়ে এই প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ রায় সংরক্ষিত রেখেছে। একজন সদস্যের বেঞ্চ এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না, সেটিও আদালতের বিবেচনাধীন।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ইডির সিদ্ধান্ত যাচাইয়ের ব্যবস্থাটি কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্ন। তদন্তকারী সংস্থা কোনও সম্পত্তিকে অপরাধলব্ধ অর্থের সঙ্গে যুক্ত বলে সাময়িকভাবে আটক করলে, সেই নির্দেশ বহাল রাখার যথেষ্ট ভিত্তি আছে কি না, তা পরীক্ষা করে এই কর্তৃপক্ষ। নাগরিকের সম্পত্তির অধিকারকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় যথাযথ বিচারবিবেচনা হচ্ছে কি না, শুনানিতে তা নিয়েই সংশয় প্রকাশ করেছে আদালত।

বিচারপতি বাগচী কাজের বিপুল চাপের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর প্রশ্ন, ছয় মাসে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার বিষয় পরীক্ষা করতে হলে এক, দুই কিংবা তিন সদস্যের একটি সংস্থা প্রতিটি ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনোযোগ দেবে কীভাবে? নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাগিদে পুরো প্রক্রিয়া নিছক তৈরি সিদ্ধান্তে সই করার আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হচ্ছে কি না, সেই উদ্বেগও উঠে আসে।

আবেদনকারীদের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী বিক্রম চৌধুরীর বক্তব্য, কর্তৃপক্ষের কাজ নিছক প্রশাসনিক নয়, বিচারধর্মী। কারণ, সম্পত্তি আটকের নির্দেশ বহাল থাকবে কি না, তার সিদ্ধান্ত মানুষের অধিকারে সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাঁর যুক্তি, আইনে চেয়ারম্যান এবং আরও দুই সদস্য নিয়ে কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে। বিচারবিভাগীয় সদস্যের উপস্থিতি তাই অপরিহার্য; তাঁকে বাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈধতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

চৌধুরী আরও জানান, দীর্ঘদিন একজন সদস্যই এই কর্তৃপক্ষের কাজ চালিয়েছেন; সম্প্রতি আইনক্ষেত্রের আরেক সদস্য যুক্ত হয়েছেন। বিজয় মদনলাল চৌধুরী মামলায় পিএমএলএ আইনের বিভিন্ন বিধান বহাল রাখার সময় সুপ্রিম কোর্ট তিন সদস্যের কর্তৃপক্ষের কাঠামো বিবেচনা করেছিল বলেও আবেদনকারীরা উল্লেখ করেন। তাঁদের বক্তব্য, ইডির ক্ষমতার উপর স্বাধীন নজরদারির যে সুরক্ষাব্যবস্থা ধরে নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার কার্যকারিতা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

ইডির পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল অনিল কৌশিক পাল্টা যুক্তি দেন, আইনের ছয় ধারাতেই এক বা দুই সদস্যের বেঞ্চ গঠনের সুযোগ রয়েছে। কোনও বিষয় দুই সদস্যের বেঞ্চে শোনা প্রয়োজন মনে হলে তা সেখানে পাঠানো যায়। তাঁর মতে, এই বিধান থেকেই স্পষ্ট যে অন্য ক্ষেত্রে একজন সদস্যও শুনানি করতে পারেন। আইনের বিভিন্ন অংশ পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করতে হবে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, আইনের কাঠামো, বিধানগুলির বিন্যাস এবং সেগুলির যথাযথ ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই প্রশ্নটির নিষ্পত্তি করতে হবে। ফলে বিচারবিভাগীয় সদস্য থাকা প্রয়োজন কি না এবং এক সদস্যের বেঞ্চ আইনসম্মত কি না, দুটিই নির্দিষ্ট বিধানের আলোকে বিচার করা হচ্ছে। শুনানির প্রশ্ন বা উদ্বেগকে ইতিমধ্যেই দেওয়া চূড়ান্ত নির্দেশ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই।

শুনানিতে থাকা আবেদনগুলির একটি কার্ভি রিয়্যালটির। সংস্থাটি তেলঙ্গানা হাই কোর্টের ২০২৪ সালের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছে। সেই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, আইনক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা না থাকলেও নির্ণায়ক কর্তৃপক্ষের একক সদস্য আট ধারার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। সর্বোচ্চ আদালতে সেই আইনি ব্যাখ্যার যথার্থতাও এখন বিচারাধীন রয়েছে।

মামলার সংখ্যাও শুনানিতে বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। আবেদনকারীদের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণনের দাবি, ইডির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে শুরু হওয়া ৮,৮৫১টি মামলার মধ্যে মাত্র ৬০টি বিচারপর্বে পৌঁছেছে। তাঁর আশঙ্কা, বিচার এগোনোর আগেই সম্পত্তির উপর বিধিনিষেধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বহু বছর তার পরিণাম ভোগ করতে হতে পারে।

তবে কৌশিক ওই পরিসংখ্যানের যথার্থতা নিয়ে আপত্তি জানান। ফলে সব মামলাতেই সম্পত্তি আটক হয়েছে কিংবা উল্লিখিত সংখ্যাগুলি আদালতের যাচাইয়ে প্রতিষ্ঠিত, এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না। কতগুলি ঘটনায় সম্পত্তি আটক হয়েছে, সে বিষয়ে আদালত তথ্য চেয়েছে। বার অ্যান্ড বেঞ্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইডিকে দুই দিনের মধ্যে হলফনামায় বিস্তারিত হিসাব জমা দিতে বলা হয়েছে।

আইনি প্রক্রিয়ায় কয়েকটি আলাদা ধাপ রয়েছে। পাঁচ ধারায় নির্দিষ্ট শর্তে ইডি সর্বোচ্চ ১৮০ দিনের জন্য সাময়িকভাবে সম্পত্তি আটকের নির্দেশ দিতে পারে। নির্দেশ দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নির্ণায়ক কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে হয়। এরপর আট ধারার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য, ইডির দাবি এবং প্রাসঙ্গিক নথি বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে, সম্পত্তিটি অর্থপাচারের সঙ্গে যুক্ত কি না।

সম্পত্তি আটকের নির্দেশ অনুমোদন এবং চূড়ান্ত বাজেয়াপ্তকরণ অবশ্য পৃথক বিষয়। প্রথমটির মাধ্যমে সম্পত্তির হস্তান্তর বা অন্যভাবে সরিয়ে দেওয়ার উপর বিধিনিষেধ বহাল থাকে। চূড়ান্ত বাজেয়াপ্তকরণের প্রশ্ন আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিশেষ আদালতের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। তাই কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন, অথবা সম্পত্তি চূড়ান্তভাবে সরকারের হয়ে গিয়েছে, এমন নয়।

নির্ণায়ক কর্তৃপক্ষের নির্দেশের বিরুদ্ধে আপিলের ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু পরবর্তী স্তরে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ থাকলেও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান কতটা সুরক্ষিত, বর্তমান শুনানিতে সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। সম্পত্তির সঙ্গে অপরাধের যোগ রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের প্রথম পর্যায়েই যথাযথ শুনানি এবং স্বাধীন বিচারবিবেচনার গুরুত্ব রয়েছে। সেই কারণেই সদস্যসংখ্যার পাশাপাশি সদস্যদের যোগ্যতা ও বিচারধর্মী ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক।

এই মামলার তাৎপর্য তাই ইডির ক্ষমতার পরিধি ছাড়িয়ে সেই ক্ষমতা প্রয়োগের উপর নজরদারির ব্যবস্থাতেও। অপরাধলব্ধ সম্পদ সরিয়ে ফেলা ঠেকানোর উদ্দেশ্য পূরণ করতে গিয়ে নির্ণায়ক কর্তৃপক্ষ কীভাবে নাগরিকের বক্তব্য পরীক্ষা করবে, তার প্রাতিষ্ঠানিক শর্ত নির্ধারণ জরুরি হয়ে উঠেছে। সংরক্ষিত রায়ে সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যাই জানাবে, বর্তমান আইনের অধীনে বিচারবিভাগীয় সদস্য ছাড়া একজনের বেঞ্চের সিদ্ধান্ত কতটা গ্রহণযোগ্য।