প্রার্থনাসভায় হামলা বনাম ধর্মান্তরণের অভিযোগ: রাজ্যে ধর্মাচরণের অধিকার নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

যা জানা জরুরি
- পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় খ্রিস্টানদের প্রার্থনাসভায় হামলা, ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
- পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, নিরাপত্তার আশঙ্কায় কয়েকটি খ্রিস্টান সংগঠন আপাতত বাড়িতে প্রার্থনাসভা এবং ধর্মযাজকদের পারিবারিক পরিদর্শন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
- অন্য দিকে, রাজ্য সরকারের বক্তব্য—নিজের পছন্দমতো ধর্মাচরণের অধিকার প্রত্যেকের থাকলেও জোর করে বা প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরণ ঘটানোর অভিযোগ উঠলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় খ্রিস্টানদের প্রার্থনাসভায় হামলা, ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, নিরাপত্তার আশঙ্কায় কয়েকটি খ্রিস্টান সংগঠন আপাতত বাড়িতে প্রার্থনাসভা এবং ধর্মযাজকদের পারিবারিক পরিদর্শন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্য দিকে, রাজ্য সরকারের বক্তব্য—নিজের পছন্দমতো ধর্মাচরণের অধিকার প্রত্যেকের থাকলেও জোর করে বা প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরণ ঘটানোর অভিযোগ উঠলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছে হাওড়ার উলুবেড়িয়ায়। গত ২৩ আগস্ট রবিবার একটি ভাড়া করা বাড়িতে প্রায় ৬০ জন নারী-পুরুষ প্রার্থনায় যোগ দিয়েছিলেন। যাজক মিঠুন হাজরার দাবি, সকাল ১১টা নাগাদ প্রার্থনা শুরু হয়েছিল। বিকেল তিনটে নাগাদ স্লোগান দিতে দিতে একদল মানুষ বাড়িটিতে ঢুকে পড়ে। প্রার্থনায় উপস্থিত ব্যক্তিদের মারধরের পাশাপাশি শব্দযন্ত্র, মঞ্চ, টেবিল, চেয়ার এবং পাখা ভেঙে দেওয়া হয়। ঘটনাটির একটি দৃশ্য সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
মিঠুনের বক্তব্য, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে এবং অন্যদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসার পরে তাঁরা থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু আতঙ্ক কাটেনি। ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় আর কোনও গৃহপ্রার্থনা আয়োজন করা হয়নি। হাওড়া গ্রামীণের পুলিশ সুপার অমিত বর্মা অভিযোগ এবং মামলা দায়েরের কথা স্বীকার করেছেন। তদন্ত চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে এখনও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার প্রতিষ্ঠাতা হেরড মল্লিকের দাবি, উলুবেড়িয়ার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একই ধরনের হামলা ঘটেছে এবং আক্রান্তদের আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ৩০ আগস্ট হাওড়ার জগৎবল্লভপুর এবং উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জেও গৃহপ্রার্থনা ঘিরে গোলমালের অভিযোগ পাওয়া যায়।
এর আগে ১৪ আগস্ট পূর্ব বর্ধমানের সাহানগরে সেন্ট ক্ল্যারেট গির্জা সংলগ্ন এলাকায় এক মহিলার শেষকৃত্য বাধা পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। গির্জার দায়িত্বপ্রাপ্ত যাজক স্যামুয়েল হেমব্রমের দাবি, একদল মানুষ এসে কবরস্থানের জমির নথি দেখতে চায়। নথি আনার জন্য কিছুটা সময় চাওয়া হলেও দেহ সমাধিস্থ করতে দেওয়া হয়নি। ইতিমধ্যে কবরে নামানো মৃতদেহ তুলে নিয়ে যেতে বাধ্য হন পরিজনেরা। শেষ পর্যন্ত বর্ধমান শহরের অন্য একটি কবরস্থানে সমাধি সম্পন্ন হয়।
যাজকের অভিযোগ, পুলিশ সুপার এবং সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিককে ই-মেলের মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদিও পূর্ব বর্ধমানের পুলিশ সুপার পুষ্পার বক্তব্য, মৃত মহিলা স্থানীয় বাসিন্দা ছিলেন না বলেই কয়েকজন আপত্তি তুলেছিলেন। সংশ্লিষ্ট জমিটি কবরস্থান, না ব্যক্তিগত মালিকানাধীন—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শোকাহতদের মারধরের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন। তবে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হয়েছিল এবং পুলিশের অগ্রাধিকার ছিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা।
হাওড়ার ঘুসুড়িতেও ২৫ আগস্ট একটি বাড়িতে আয়োজিত প্রার্থনাসভায় হামলার অভিযোগ ওঠে। চার্চ অব দ্য গ্রেসের যাজক সুরজ সরোজের দাবি, কয়েকজনকে মারধর করা হয় এবং অনেকে আহত হন। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করলেও হামলাকারীরা কথা শুনতে রাজি হয়নি। থানায় গিয়ে তাঁদের কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় বলেও অভিযোগ। তাঁর দাবি, পুলিশ উল্টে গির্জার পরিচয়, অর্থের উৎস এবং অনুমোদনের কাগজপত্র নিয়ে প্রশ্ন করে। শেষ পর্যন্ত তাঁরা লিখিত অভিযোগ করেননি। নিরাপত্তার কথা ভেবে আপাতত গৃহপ্রার্থনা ও বাড়ি-বাড়ি ধর্মীয় পরিদর্শন স্থগিত রাখা হয়েছে। পুলিশ এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।
২৬ আগস্ট পূর্ব মেদিনীপুরের চেক মাইলপোস্ট গ্রামেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। যাজক জয় সূত্রধরের অভিযোগ, প্রার্থনাসভায় ঢুকে একদল মানুষ তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে মারধর করে। তাঁদের বিরুদ্ধে জোর করে ধর্মান্তরণের অভিযোগ তুলে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। আইনজীবীরা পৌঁছনোর পরে তাঁরা ছাড়া পান। ভয়ে প্রথমে অভিযোগ দায়ের না করলেও পরে ই-মেলে পুলিশের কাছে অভিযোগ পাঠানো হয়।
আক্রমণের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে উঠেছে, সেই হিন্দুত্ববাদী সংগঠন সিংহবাহিনীর সভাপতি দেবদত্ত মাজির পাল্টা দাবি, উলুবেড়িয়া-সহ বিভিন্ন এলাকায় অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরণ চলছে। তাঁদের প্রতিবাদ তারই বিরুদ্ধে।
রাজ্যের আদিবাসী উন্নয়ন ও সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু বলেছেন, প্রার্থনা করা ব্যক্তিগত ধর্মীয় অধিকারের বিষয় এবং সরকার কারও বিশ্বাসে হস্তক্ষেপ সমর্থন করে না। তবে স্বেচ্ছায় ধর্মবদল এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরণ এক নয়; দ্বিতীয়টির অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন তার পথে চলবে।
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম ধর্মাচরণের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার কথা বলেছেন। তৃণমূল মুখপাত্র প্রদীপ্ত মুখোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে ভয়ের রাজনীতি করার অভিযোগ তুলেছেন। বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ রাহুল সিনহা অবশ্য জানিয়েছেন, ঘটনাগুলি সম্পর্কে তিনি অবহিত নন। হামলা ও পাল্টা ধর্মান্তরণের অভিযোগের এই আবহে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—নাগরিকের ধর্মাচরণের অধিকার এবং অভিযোগের তদন্তের মাঝখানে হিংস্র জনতার স্থান কোথায়?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



