নয় দিন অন্ধকারের পরে গ্রামের উঠোনে: নেপালের শ্রমিকের অসম্ভব প্রত্যাবর্তন

যা জানা জরুরি
- নেপালের দক্ষিণের তিলাঠি কৈলাড়ি গ্রামে ১৩ সেপ্টেম্বর সঞ্জয় সাহকে স্বাগত জানাতে পরিবার ও প্রতিবেশীরা জড়ো হয়েছিলেন।
- প্রথাগত আচার, আলিঙ্গন ও কান্নার মধ্যে বাড়ি ফিরলেন ৩০ বছরের এই যন্ত্রকর্মী।
- কিন্তু আনন্দের পাশেই ছিল অনুপস্থিত মানুষের শোক।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নেপালের দক্ষিণের তিলাঠি কৈলাড়ি গ্রামে ১৩ সেপ্টেম্বর সঞ্জয় সাহকে স্বাগত জানাতে পরিবার ও প্রতিবেশীরা জড়ো হয়েছিলেন। প্রথাগত আচার, আলিঙ্গন ও কান্নার মধ্যে বাড়ি ফিরলেন ৩০ বছরের এই যন্ত্রকর্মী। কিন্তু আনন্দের পাশেই ছিল অনুপস্থিত মানুষের শোক। ২৬ অগস্ট নেপাল–তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ-শিলা ধসে যে কাদা ও জলের প্রাচীর নেমেছিল, তার পরে আপার ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে নয় দিন আটকে ছিলেন সঞ্জয়। এক সপ্তাহ হাসপাতালে কাটিয়ে তাঁর এই ঘরে ফেরা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ১৩ সেপ্টেম্বর, পরের দিন প্রকাশ পায় ভিডিও।
বিপর্যয়ের সময়ে সঞ্জয় ছিলেন যান্ত্রিক ফোরম্যান। বন্যার জল ও ধ্বংসস্তূপ সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ বন্ধ করে দিলে বাইরের আলো, খাবার ও সময়ের হিসাব—সব হারিয়ে যায়। তিনি তুলনায় নিরাপদ একটি জায়গায় স্থির থাকার সিদ্ধান্ত নেন। চোখ দীর্ঘ অন্ধকারে অভ্যস্ত থাকায় হঠাৎ আঘাত এড়াতে অধিকাংশ সময় বন্ধ রেখেছিলেন। খাবার ছিল না; বন্যার জল এবং পাহাড়ের গা বেয়ে চুঁইয়ে পড়া জল পান করে বেঁচে ছিলেন। তাঁর ধর্মবিশ্বাস ও মন্ত্রজপ ভয় সামলাতে সাহায্য করেছে—এটি তাঁর নিজের বর্ণনা, চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনও সাধারণ বেঁচে থাকার সূত্র নয়।
দিন গোনার উপায় ছিল না। প্রথম দিকে দ্রুত উদ্ধার আসবে বলে আশা করেছিলেন, পরে সেই বিশ্বাস দুর্বল হয়। শেষ দিকে বাইরে যন্ত্রের শব্দ শুনে বুঝতে পারেন উদ্ধারকারীরা কাছে এসেছেন। তাঁকে ধ্বংসাবশেষে চাপা ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার করা তিন জনের একজন বলা হয়েছে। তীব্র অন্ধকার, অনাহার, দূষিত জল ও আঘাতের পর বেঁচে থাকা বিরল; তার পরেও সংক্রমণ, কিডনির সমস্যা, পেশির ক্ষয় এবং মানসিক আঘাতের দীর্ঘ চিকিৎসা লাগতে পারে।
এই একটি প্রত্যাবর্তন বিপর্যয়ের সামগ্রিক ছবি ঢাকে না। ১৩ সেপ্টেম্বরের সরকারি হিসাব অনুযায়ী নেপালে অন্তত ১,৩৮৬ জন মারা গেছেন এবং ৫,১৩০ জন নিখোঁজ। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রায় ৯০০ শ্রমিকেরও সন্ধান নেই। তিব্বতের ক্ষয়ক্ষতিসহ সংখ্যা সময়ের সঙ্গে বদলেছে; যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকায় গণনা এখনও কঠিন। সঞ্জয় যাঁদের সরতে বলেছিলেন, তাঁদের কয়েকজন ভেসে গেছেন—বেঁচে ফেরার স্বস্তির সঙ্গে সেই স্মৃতিও তিনি বহন করছেন।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে ভূমিকম্পের কথা উঠলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ পরে জানায়, ধসের শক্তিই ভূকম্পন-সংকেত তৈরি করেছিল। বিজ্ঞানীরা উষ্ণায়নকে একমাত্র তাৎক্ষণিক কারণ বলেননি। তবে উচ্চ পর্বতে বরফ গলা, জমাট মাটির দুর্বল হওয়া এবং অস্থিতিশীল হ্রদ বাড়ার দীর্ঘ প্রবণতা এমন বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। নির্মাণশ্রমিক ও নিম্ন উপত্যকার জনপদ সেই পরিবর্তনের প্রথম সারিতে থাকে।
জলবিদ্যুৎ নেপালের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ-নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু পাহাড়ে সুড়ঙ্গ নির্মাণের ঝুঁকি শূন্য নয়। সতর্কীকরণ, বহির্গমনের একাধিক পথ, জরুরি খাদ্য-জল, কর্মীদের উপস্থিতির নিখুঁত তালিকা এবং সীমান্ত-পার তথ্যবিনিময়—এই দুর্যোগের পরে পরীক্ষা করা দরকার। একজন শ্রমিকের উপস্থিতবুদ্ধি প্রতিষ্ঠানগত নিরাপত্তার বিকল্প হতে পারে না।
উদ্ধারকাহিনি সহজে ‘অলৌকিক’ শব্দে থেমে যায়। সঞ্জয়ের ক্ষেত্রে অলৌকিকতার ভিতরে ছিল নিরাপদ জায়গা বাছা, অল্প জল, উদ্ধারকারীর কাজ এবং অসংখ্য অনুকূল কাকতাল। তাঁর প্রত্যাবর্তন আশা দেয়, কিন্তু হাজারো নিখোঁজ পরিবারের অপেক্ষা শেষ করে না। সত্যিকারের সম্মান হবে তাঁকে শুধু এক দিনের নায়ক না বানিয়ে দীর্ঘ পুনর্বাসন দেওয়া এবং যে প্রকল্পে শ্রমিকেরা কাজ করেন, সেখানে বিপদের সময় বাঁচার সুযোগকে ভাগ্যের উপর না রাখা।
ঘরে ফেরাই পুনরুদ্ধারের শেষ নয়। দীর্ঘ অনাহার ও স্থিরতার পরে শরীরের শক্তি ফিরতে সময় লাগে; দুঃস্বপ্ন, হঠাৎ শব্দে ভয় বা কাজে ফেরার দ্বিধাও দেখা দিতে পারে। সঞ্জয় আবার কাজে যেতে রাজি হওয়ার কথা বলেছেন, কিন্তু সেই সম্মতি অর্থনৈতিক বাধ্যতা থেকে কতটা মুক্ত, তা অজানা। নিয়মিত চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, হারানো মজুরি ও পরিবারের নিরাপত্তাসহ দীর্ঘ পুনর্বাসনই তাঁকে নিজের গতিতে সিদ্ধান্তের সুযোগ দেবে এবং মর্যাদা রক্ষা করবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



