ভুবনডাঙা

‘ব্রাজিলকোর’ ট্রেন্ডে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হলুদ-সবুজ রং

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • রিও দে জেনেইরোর দোকানে হলুদ-সবুজ ফুটবল জার্সি, হাভাইয়ানাস চটি কিংবা দেশের নাম লেখা আঁটসাঁট গেঞ্জি নতুন কিছু নয়।
  • নতুন হল সেই পোশাকের আন্তর্জাতিক যাত্রা এবং দেশের ভিতরে তার অর্থবদল।
  • গত কয়েক বছরে মঞ্চ, বিমানবন্দর ও সামাজিক মাধ্যমে ব্রাজিলের রং, সংগীত ও সৈকতের চিহ্ন নিয়ে যে সাজ ছড়িয়েছে, তার নাম হয়েছে ‘ব্রাজিলকোর’।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

রিও দে জেনেইরোর দোকানে হলুদ-সবুজ ফুটবল জার্সি, হাভাইয়ানাস চটি কিংবা দেশের নাম লেখা আঁটসাঁট গেঞ্জি নতুন কিছু নয়। নতুন হল সেই পোশাকের আন্তর্জাতিক যাত্রা এবং দেশের ভিতরে তার অর্থবদল। গত কয়েক বছরে মঞ্চ, বিমানবন্দর ও সামাজিক মাধ্যমে ব্রাজিলের রং, সংগীত ও সৈকতের চিহ্ন নিয়ে যে সাজ ছড়িয়েছে, তার নাম হয়েছে ‘ব্রাজিলকোর’। ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে স্থানীয় শিল্পী, ব্যবসায়ী ও পর্যটনকর্মীরা বলেছেন, বাইরের কৌতূহলের সঙ্গে ব্রাজিলীয়দের নিজেদের সংস্কৃতি প্রকাশের আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। কিন্তু জাতীয় পতাকার রং কোনও নির্দোষ কাপড় নয়; সাম্প্রতিক রাজনীতিতে তার দখল নিয়েও লড়াই হয়েছে।

প্রবণতাটি মোটামুটি ২০২৩ সাল থেকে দৃশ্যমান। ব্যাড বানি থেকে এমিলি রাতাজকোভস্কি ও হেইলি বিবারের মতো আন্তর্জাতিক তারকারা ব্রাজিলীয় জার্সি বা রঙে ছবি তুলেছেন। আনিত্তার ফাঙ্ক সংগীত, নাচের ছোট ভিডিও, কার্নিভালের দৃশ্য এবং ব্রাজিলীয় নকশা একই অ্যালগরিদমিক স্রোতে মিলেছে। ২০২৪ সালে মাদোনার এবং পরে শাকিরার কোপাকাবানা সৈকতের বিরাট বিনামূল্যের অনুষ্ঠান রিওকে বিশ্বদর্শকের পর্দায় ফিরিয়েছে। ওয়াল্টার সালেসের ‘আই’ম স্টিল হিয়ার’ আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও অস্কার-আলোচনায় ব্রাজিলীয় সিনেমার উপস্থিতিও বাড়িয়েছে।

ফুটবল জার্সির অর্থ বিশেষভাবে বদলেছে। জাইর বলসোনারোর সমর্থকেরা বহু বছর জাতীয় দলের হলুদ জার্সি ও পতাকাকে রাজনৈতিক সমাবেশের প্রধান চিহ্ন করেছিলেন। ফলে অনেক বিরোধী নাগরিক সেই পোশাক এড়িয়ে চলতেন। বিশ্বকাপ, পপ-সংস্কৃতি ও নতুন নকশার মাধ্যমে তরুণেরা রংগুলি আবার দলীয় পরিচয়ের বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই পুনর্দখল সম্পূর্ণ হয়েছে বলা যাবে না; একই প্রতীক এখনও আলাদা মানুষের কাছে আলাদা রাজনৈতিক স্মৃতি বহন করে। ‘ব্রাজিলকোর’ তাই কেবল গ্রীষ্মের পোশাক নয়, জাতীয় পরিচয়ের দরকষাকষিও।

পর্যটনের অঙ্ক প্রবণতার বাস্তব দিক দেখায়। ব্রাজিল ২০২৫ সালে রেকর্ড ৯২ লক্ষ ৮৭ হাজারের বেশি আন্তর্জাতিক আগমন নথিবদ্ধ করেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আগমন প্রায় ৫২ লক্ষ ৬০ হাজার এবং বিদেশি পর্যটকের ব্যয় প্রায় ৫৬০ কোটি ডলার বলে এমব্রাতুর জানিয়েছে। শুধু সামাজিক মাধ্যম এই বৃদ্ধি ঘটিয়েছে—এমন প্রমাণ নেই; নতুন বিমানপথ, মুদ্রামান, প্রচার ও বড় অনুষ্ঠানও ভূমিকা রেখেছে। তবু ইনফ্লুয়েন্সারের ভিডিওর পরে রিওর রোসিনিয়া বসতিতে পর্যটক বাড়ার কথা স্থানীয় পথপ্রদর্শকেরা জানিয়েছেন।

সেখানেই অস্বস্তির প্রশ্ন। একটি জীবন্ত এলাকা কি তার বাসিন্দাদের শর্তে দেখা হচ্ছে, না দারিদ্র্যকে বিদেশি দর্শকের পটভূমি বানানো হচ্ছে? অনুমোদিত স্থানীয় পথপ্রদর্শক, বাসিন্দার গোপনীয়তা ও আয়ের ভাগ না থাকলে ‘বাস্তব ব্রাজিল’ দেখার দাবি সহজেই দৃষ্টিকটু হয়ে ওঠে। একইভাবে আন্তর্জাতিক পোশাকসংস্থা যদি শুধু পতাকার রং বিক্রি করে, অথচ ব্রাজিলীয় নকশাকার ও কারিগর বাজারে জায়গা না পান, তবে সাংস্কৃতিক জনপ্রিয়তার লাভ বাইরে চলে যায়।

‘ব্রাজিল’ নামে একটিমাত্র নান্দনিকতাও নেই। আমাজন, উত্তর-পূর্বের আফ্রো-ব্রাজিলীয় ঐতিহ্য, সাঁও পাওলোর নগরজীবন, দক্ষিণের অভিবাসী ইতিহাস এবং আদিবাসী সংস্কৃতি হলুদ-সবুজ সৈকতছবিতে ধরে না। ভোগের উপযোগী কয়েকটি চিহ্ন দেশটির বর্ণ, শ্রেণি ও আঞ্চলিক অসমতা আড়াল করতে পারে। ব্রাজিলীয় নকশাকারদের কেউ তাই আন্তর্জাতিক আগ্রহকে স্বাগত জানালেও গভীরতর সহযোগিতা, উৎপাদন ও স্বীকৃতি দাবি করছেন।

ফ্যাশনের ঢেউয়ের আয়ু ছোট; নরম শক্তির ভিত্তি দীর্ঘ প্রতিষ্ঠান, শিল্পীর অধিকার এবং দর্শকের পুনরাগমন। ‘ব্রাজিলকোর’ সফল হবে কি না, তা কত জার্সি বিক্রি হল দিয়ে নয়—ব্রাজিলীয় শিল্পী, সংগীতকর্মী ও স্থানীয় পর্যটনব্যবসা কতটা মূল্য পেল দিয়ে বিচার করা উচিত। দেশের রংকে এক রাজনৈতিক শিবিরের হাত থেকে ফেরানো তাৎপর্যপূর্ণ; কিন্তু রংয়ের নীচে দেশের বহু কণ্ঠকে দৃশ্যমান করাই পরের কঠিন কাজ। বিশ্ব এখন ব্রাজিলের দিকে তাকিয়েছে—ক্যামেরার ফ্রেম কে ঠিক করছে, প্রশ্নটি সেখানেই।

রাষ্ট্র এই অনুকূল মুহূর্তকে পর্যটন ও সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে কাজে লাগাচ্ছে। কিন্তু সরকারি প্রচার আর স্বতঃস্ফূর্ত অনলাইন আগ্রহ এক নয়। প্রথমটি বিমানপথ, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগে স্থায়ী ফল চাইবে; দ্বিতীয়টি পরের ঋতুতেই অন্য রঙে চলে যেতে পারে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles