বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অস্থায়ী সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে আমেরিকায় নতুন করে দ্বিদলীয় সমালোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট নেতারা চুক্তিটিকে দুর্বল ও অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া বলে আক্রমণ করছেন, অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডে চলা সরাসরি মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনার অগ্রগতির কথা তুলে ধরে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স।
লুসার্নে আমেরিকা ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক শুরুর মধ্যেই ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে কঠোর বার্তা দেন। তিনি দাবি করেন, ইরানকে অবিলম্বে লেবাননে তাদের মিত্র হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। অন্যথায় আমেরিকা আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
এই মন্তব্যের পরপরই ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানায়, ইরানি প্রতিনিধিদল আলোচনাস্থল ত্যাগ করেছে। তাদের বক্তব্য, আলোচনার সূচনার সময়ই ট্রাম্প নতুন করে হুমকি দিয়েছেন, যা আলোচনার পরিবেশকে জটিল করে তুলেছে।
এদিকে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের চুক্তি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর জন কর্নিন বলেন, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ ছেড়ে দিলে তেহরান আবার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে বিনিয়োগ করতে পারবে। তাঁর মতে, ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস না করেই অর্থনৈতিক ছাড় দেওয়া ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক।
ডেমোক্র্যাট শিবির থেকেও তীব্র সমালোচনা এসেছে। সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সুসান রাইস এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চুক্তিটিকে “ভঙ্গুর” এবং “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” বলে অভিহিত করেন। তাঁর অভিযোগ, পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াই ইরানকে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
রাইস বলেন, নতুন সমঝোতা অনুযায়ী ইরান এখন বাধাহীনভাবে তেল ও তেলজাত পণ্য বিক্রি করতে পারবে এবং সেই অর্থ দেশের পুনর্গঠনে ব্যবহার করতে পারবে। অথচ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।
তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়কার পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, তখন পূর্ণাঙ্গ চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়নি এবং মুক্ত করা অর্থও মানবিক খাতে ব্যয়ের শর্তে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সমঝোতায় সেই ধরনের কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর কোরি বুকার আরও কড়া ভাষায় ট্রাম্প প্রশাসনকে আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু করে পরে তা বন্ধ করার জন্য কৃতিত্ব দাবি করা অগ্নিসংযোগকারী ব্যক্তির আগুন নেভানোর কৃতিত্ব দাবি করার মতো। বুকারের অভিযোগ, এই সমঝোতায় ইরানই সব সুবিধা পাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কার্যত আত্মসমর্পণ করেছে।
রক্ষণশীল মহল থেকেও সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ আগেই মন্তব্য করেছিলেন যে, আমেরিকা এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বিপুল অর্থ দিচ্ছে যারা দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার শত্রুতা করে এসেছে। তাঁর মতে, এটি গুরুতর কৌশলগত ভুল।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডে আলোচনায় অংশ নেওয়া উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স বলেন, মাত্র কয়েক ঘণ্টার আলোচনাতেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং তিনি আশা করছেন পরবর্তী পর্যায়েও ইতিবাচক ফল মিলবে।
লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে ভ্যান্স বলেন, এ ধরনের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া সবসময়ই জটিল হয়, তবে তিনি বর্তমান অবস্থান নিয়ে আশাবাদী। তাঁর ভাষায়, এখনও অনেক কাজ বাকি থাকলেও আলোচনা সঠিক পথে এগোচ্ছে।
মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটও আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের ফলে ইরান আগের তুলনায় অনেক দুর্বল অবস্থানে রয়েছে এবং সেই কারণেই আলোচনার সমীকরণ বদলে গেছে।
জ্বালানি বাজারের প্রসঙ্গে তিনি জানান, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহণ ইতিমধ্যে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। ফলে যুদ্ধপূর্ব জ্বালানি দামের দিকে ধীরে ধীরে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতি এখন এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে সুইজারল্যান্ডে শান্তি আলোচনা চলছে এবং প্রশাসন অগ্রগতির দাবি করছে; অন্যদিকে আমেরিকার দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতারা মনে করছেন, তেহরানকে অত্যধিক ছাড় দিয়ে ওয়াশিংটন ভবিষ্যতের আরও বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। ফলে আলোচনার পরবর্তী ধাপ এবং চূড়ান্ত চুক্তির শর্তই নির্ধারণ করবে এই সমঝোতা সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনে, নাকি নতুন বিতর্ক ও সংঘাতের ভিত্তি গড়ে দেয়।