Table of Contents
হাইলাইটস:
- ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনী জয়ের মাত্র দু’বছরের মাথায় প্রধানমন্ত্রী ও লেবার নেতা পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন কেইর স্টারমার।
- “পরিবর্তন” ও “ন্যায্য ব্রিটেন”-এর প্রতিশ্রুতি দিলেও জনসমর্থন দ্রুত হারায় তাঁর সরকার।
- উপহার ও বিনামূল্যের টিকিট গ্রহণ নিয়ে “ফ্রিবিজ গেট” কেলেঙ্কারি শুরু থেকেই ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে।
- ব্রেক্সিট-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট, ব্যয়সংকোচন, কল্যাণনীতির বিতর্ক এবং দলীয় বিদ্রোহ স্টারমারকে ক্রমশ দুর্বল করে।
- লেবারের দুর্বলতার সুযোগে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে নাইজেল ফারাজের রিফর্ম ইউকে।
- সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে ভরাডুবি এবং অ্যান্ডি বার্নহ্যামের উত্থান স্টারমারের পতন ত্বরান্বিত করে।
ঐতিহাসিক জয়, কিন্তু ক্ষণস্থায়ী সাফল্য
২০২৪ সালের ব্রিটিশ সাধারণ নির্বাচনে ৪১২টি আসন জিতে ১৪ বছর পর ক্ষমতায় ফিরেছিল লেবার পার্টি। নেতৃত্বে ছিলেন কেইর স্টারমার। নির্বাচনী প্রচারে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন একটি আরও ন্যায্য, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ ব্রিটেন গড়ার। অনেকেই আশা করেছিলেন, ১৯৯৭ সালে টনি ব্লেয়ার-এর ঐতিহাসিক জয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে।
কিন্তু সেই আশা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র দু’বছরের মধ্যেই স্টারমারকে প্রধানমন্ত্রী ও দলনেতার পদ ছাড়তে হল। তাঁর পতন শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়, বরং ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনের গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটেরও প্রতিচ্ছবি।
প্রথম ১০০ দিনেই শুরু বিপর্যয়
ক্ষমতায় আসার পর সাধারণত নতুন সরকারের জন্য প্রথম ১০০ দিনকে ‘মধুচন্দ্রিমা পর্ব’ বলা হয়। কিন্তু স্টারমারের ক্ষেত্রে সেই সময়টাই হয়ে ওঠে বিতর্কের সূচনা।
প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার পাউন্ড মূল্যের উপহার, ফুটবল ম্যাচ ও কনসার্টের বিনামূল্যের টিকিট গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। সংবাদমাধ্যমে এই বিতর্ক “ফ্রিবিজ গেট” নামে পরিচিতি পায়।
জনরোষ এতটাই তীব্র হয় যে স্টারমার পরে উপহার ও টিকিটের অর্থ ফেরত দেন এবং নতুন অনুদান নীতি চালু করেন। কিন্তু ততদিনে ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল। ক্ষমতায় আসার মাত্র দু’মাসের মধ্যে ৪৩ শতাংশ ভোটার তাঁকে খারাপ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে শুরু করেন। ২০২৬ সালের জুনে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৩ শতাংশে।
একের পর এক নীতি-ভ্রষ্ট সিদ্ধান্ত
স্টারমারের সরকার জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা বা এনএইচএসকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিল। কিন্তু তার জন্য প্রায় এক কোটি প্রবীণের শীতকালীন জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এছাড়া সাজা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ১,৭০০ বন্দিকে মুক্তি দেওয়া, প্রধানমন্ত্রীর চিফ অব স্টাফ সু গ্রের উচ্চ পারিশ্রমিক, এবং পরবর্তী অর্থবর্ষে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের ব্যয়সংকোচনের পরিকল্পনা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।
সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলির মধ্যে ছিল “টু-চাইল্ড বেনিফিট ক্যাপ”। ২০১৭ সালে কনজারভেটিভ সরকার চালু করা এই নীতির বিরোধিতা বহু বছর ধরে করে এসেছে লেবার। অথচ ক্ষমতায় এসে স্টারমার সেটি বহাল রাখেন। দলীয় সাংসদদের একাংশও এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সরকার নীতিটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
ব্রেক্সিটের অভিশাপ থেকে মুক্তি মেলেনি
স্টারমারের পদত্যাগ এমন এক সময়ে এল, যখন ব্রিটেন ব্রেক্সিটের দশম বর্ষপূর্তি পালন করতে চলেছে।
২০১৬ সালের গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিল ব্রিটেন। সমর্থকদের দাবি ছিল, এতে সার্বভৌমত্ব বাড়বে, অভিবাসন কমবে এবং অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
কিন্তু এক দশক পরেও পরিস্থিতি প্রত্যাশামতো নয়। অর্থনীতির সংকোচন, উচ্চ কর, ঋণের বোঝা, মূল্যবৃদ্ধি, সীমান্ত জটিলতা এবং ব্যবসায়িক সমস্যার কারণে এখন অধিকাংশ ব্রিটিশ মনে করেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।
লেবার ঐতিহাসিকভাবে ব্রেক্সিটের বিরোধী হলেও স্টারমার ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগদানের পথ নেননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল “ইইউ-যুক্তরাজ্য রিসেট”। কিন্তু কোভিড-পরবর্তী ধাক্কা, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাবের মধ্যে সেই কৌশল খুব বেশি ফল দেয়নি।
ফারাজের উত্থান, দুই দলের আধিপত্যে ফাটল
স্টারমারের দুর্বলতার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হলেন নাইজেল ফারাজে।
ব্রেক্সিট আন্দোলনের অন্যতম মুখ ফারাজ অভিবাসনবিরোধী অবস্থানকে সামনে রেখে দ্রুত জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছেন। তাঁর দল রিফর্ম ইউকে এখন ব্রিটিশ রাজনীতির প্রচলিত লেবার-কনজারভেটিভ দ্বৈত আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে।
সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে লেবারের ভরাডুবি এবং রিফর্ম ইউকের উত্থান স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়িয়ে দেয়। অনেক লেবার সাংসদ প্রকাশ্যে তাঁর নেতৃত্বের সমালোচনা শুরু করেন।
বামপন্থী ভোটও সরে গেল
শুধু ডানপন্থীরাই নয়, বাম-উদারপন্থী ভোটারদের একাংশও লেবার ছেড়ে অন্যদিকে ঝুঁকেছেন।
বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যু, ধনীদের উপর বেশি কর আরোপ এবং পরিবেশবাদী কর্মসূচির কারণে জ্যাক পোলানস্কির নেতৃত্বে গ্রিন পার্টি অফ ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। শহরাঞ্চলে বহু তরুণ ভোটার স্টারমারের পরিবর্তে গ্রিন পার্টিকে সমর্থন করতে শুরু করেন।
ফলে স্টারমার একদিকে ফারাজের ডানপন্থী চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে গ্রিনদের বামপন্থী চাপ—দুই দিক থেকেই রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
বিদেশে সাফল্য, দেশে ব্যর্থতা
বিদেশনীতি ক্ষেত্রে স্টারমারের কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, ইউরোপের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ভালো শুল্ক চুক্তি আদায় করেছিলেন এবং ভারতের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তিও করেন।
কিন্তু বিদেশের সাফল্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতাকে ঢাকতে পারেনি।
ক্রমাগত মন্ত্রীদের পদত্যাগ, নীতিগত ইউ-টার্ন, দলীয় কোন্দল, স্বাস্থ্য পরিষেবার দুরবস্থা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা—সব মিলিয়ে তাঁর সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে।
শেষ আঘাত
সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে লেবার ১,১০০-এরও বেশি কাউন্সিল আসন হারায় এবং ৩০টিরও বেশি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ খোয়ায়।
এরপর গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম একটি উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। দলের ভিতরেই স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তীব্র হয়ে ওঠে।
অবশেষে স্পষ্ট হয়ে যায় যে তিনি আর দল ও দেশের আস্থা ধরে রাখতে পারছেন না। তাই দীর্ঘ রাজনৈতিক চাপ, জনসমর্থনের পতন এবং দলীয় বিদ্রোহের মুখে স্টারমার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
উপসংহার
কের স্টারমারের পতন ব্রিটিশ রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ২০২৪ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা এক নেতা মাত্র দু’বছরের মধ্যে বিদায় নিলেন। এর পেছনে যেমন ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা রয়েছে, তেমনই রয়েছে ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনের গভীর সংকট, অর্থনৈতিক হতাশা এবং রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস।
এখন প্রশ্ন একটাই—লেবার কি নতুন নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, নাকি ২০২৯ সালের নির্বাচনে নাইজেল ফারাজ ও রিফর্ম ইউকে ব্রিটিশ রাজনীতির নতুন শক্তি হয়ে উঠবে? আগামী কয়েক বছর সেই উত্তরই দেবে।