বাংলাস্ফিয়ার: দু’শো মাইলের ব্যবধান। কিন্তু রাজনৈতিক আবহাওয়ার পার্থক্য যেন দুই যুগের।

লন্ডনে শুক্রবার সকালে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত, সংযত কণ্ঠে বলছিলেন যে তাঁর বিরুদ্ধে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব-চ্যালেঞ্জ শুরু হয়নি। তিনি লড়াই করবেন, পদ ছাড়বেন না। একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর মতো যুক্তি সাজিয়ে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন যে এখনও তাঁর সময় ফুরিয়ে যায়নি।

অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের মেকারফিল্ডে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য। উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের সামনে দাঁড়িয়ে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ঘোষণা করছিলেন, “লেবার পার্টির সামনে এটাই পরিবর্তনের শেষ সুযোগ। আর আমরা সেই সুযোগ নেব।”

দুই নেতার এই বৈপরীত্যই আজ ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।

রিফর্মের জোট ভাঙা জয়

একদিকে প্রশাসনিক দক্ষতা ও আইনি শৃঙ্খলার প্রতীক স্টারমার, অন্যদিকে আবেগ, জনসংযোগ এবং রাজনৈতিক ক্যারিশমার প্রতীক বার্নহ্যাম। লেবার পার্টির ভেতরে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা একটি অংশ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে আগামী সাধারণ নির্বাচনে দলকে বাঁচাতে হলে নেতৃত্ব বদল ছাড়া আর কোনও পথ নেই। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকায় দলের ভেতরেই এই দাবি জোরদার হয়েছে।

মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের ফলাফল সেই বিশ্বাসকে আরও জোরালো করেছে। বার্নহ্যাম সেখানে প্রায় ৫৫ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। শুধু জয় নয়, এটি ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক প্রদর্শনী। কারণ তিনি শুধু রিফর্ম ইউকের প্রার্থী রবার্ট কেনিয়নকেই হারাননি, বরং ডানপন্থী আরেক দল রিস্টোর ব্রিটেনের ভোটও কার্যত অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছেন।

অনেক বিশ্লেষক ভেবেছিলেন, ডানপন্থী ভোট বিভক্ত হয়ে গেলে বার্নহ্যাম সুবিধা পাবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, তাঁর প্রাপ্ত ভোট রিফর্ম এবং রিস্টোর ব্রিটেন—দুই দলের সম্মিলিত ভোটের চেয়েও বেশি। এটাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ।

ফারাজের ব্যাখ্যা, দলের পতনের ইঙ্গিত

গত দুই বছরে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বে রিফর্ম ইউকে ব্রিটিশ রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ব্রেক্সিট আন্দোলনের অন্যতম স্থপতি ফারাজ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত। তাঁদের দলের উত্থান রক্ষণশীল এবং লেবার—দুই দলকেই উদ্বিগ্ন করেছে।

জাতীয় জনমত সমীক্ষায় দীর্ঘদিন রিফর্ম ইউকে প্রথম স্থানে ছিল। এক সময় প্রায় ৩০ শতাংশ ব্রিটিশ ভোটার তাদের সমর্থন করছিলেন। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেই হার কমে প্রায় ২৫ শতাংশে নেমেছে। মেকারফিল্ডে পরাজয় সেই পতনের ইঙ্গিত হতে পারে।

নাইজেল ফারাজ অবশ্য ফলাফল নিয়ে হতাশা প্রকাশ করলেও ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভিন্নভাবে। তাঁর মতে, লেবার প্রচারে সফলভাবে এই বার্তা দিয়েছিল যে “বার্নহ্যামকে ভোট দিন, স্টারমারকে সরান।” অর্থাৎ অনেক ভোটার লেবারের প্রতি সমর্থনের জন্য নয়, বরং স্টারমারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতেই বার্নহ্যামকে ভোট দিয়েছেন। এই যুক্তিতে কিছু সত্যতা থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো—বার্নহ্যাম জিতেছেন, এবং বড় ব্যবধানে জিতেছেন।

নেতৃত্বের লড়াইয়ে যোগ্যতা অর্জন

এখন প্রশ্ন, এরপর কী?

প্রযুক্তিগতভাবে লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে একজনকে সংসদ সদস্য হতে হয়। বার্নহ্যাম এতদিন সেই শর্ত পূরণ করতেন না। মেকারফিল্ডে জয়ের ফলে তিনি এখন সেই বাধা অতিক্রম করেছেন।

পরবর্তী ধাপে তাঁর প্রয়োজন হবে লেবার দলের অন্তত ২০ শতাংশ সংসদ সদস্যের সমর্থন। বর্তমান হিসাবে প্রায় ৮০ জন এমপির সমর্থন পেলেই নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

তবে দলের ভেতরে অনেকেই প্রকাশ্য লড়াই চান না, কারণ একটি দীর্ঘ নেতৃত্ব-সংগ্রাম লেবারকে বিভক্ত করে দিতে পারে। সেই সুযোগ নিতে পারে রিফর্ম ইউকে এবং বিরোধীরা।

“কাস্টারের শেষ লড়াই” এড়াতে নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তনের ছক

নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ স্টিভেন ফিল্ডিংয়ের মতে, বার্নহ্যাম নিজেও চান না তাঁকে “স্টারমারের রাজনৈতিক হত্যাকারী” হিসেবে দেখা হোক। তাঁর ভাষায়, স্টারমার যদি নেতৃত্ব নির্বাচনে দাঁড়ান, তাহলে তিনি সম্ভবত হারবেন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় দলও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফিল্ডিং একে তুলনা করেছেন “কাস্টারের শেষ লড়াই”-এর সঙ্গে। অর্থাৎ এমন এক সংঘাত যেখানে শেষ পর্যন্ত কেউই জেতে না।

এই কারণেই দলের ভেতরে এখন একটি বিকল্প রূপরেখা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেটি হলো—স্টারমার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন, সম্ভব হলে সেপ্টেম্বর মাসে লেবার পার্টির বার্ষিক সম্মেলনের আগেই। এরপর বার্নহ্যামকে নেতৃত্ব দেওয়া হবে এবং সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়েস স্ট্রিটিংকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিসভার পদ দিয়ে ঐকমত্য গড়ে তোলা হবে।

স্ট্রিটিং সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদ ছেড়েছেন এবং তিনিও নেতৃত্বের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। কিন্তু জনমত সমীক্ষায় তাঁর জনপ্রিয়তা বার্নহ্যামের তুলনায় অনেক কম। ফলে বাস্তবিক অর্থে সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার এখন বার্নহ্যামই।

লেবার সাংসদ এবং বার্নহ্যামের ঘনিষ্ঠ সহযোগী লুইস হেইগ ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তাঁরা একটি “নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল” পরিবর্তন চান। তাঁর আশা, বার্নহ্যাম ও স্টারমার আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আলোচনা করবেন এবং কোনও প্রকাশ্য সংঘাত ছাড়াই সমাধানের পথ খুঁজবেন।

কিন্তু সমস্যা হলো, স্টারমার এখনও সরে যাওয়ার কোনও ইঙ্গিত দেননি। বরং তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তিনি লড়াই করবেন।

জনসনের নজির, ঝুঁকিতে স্টারমার

তবে রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে।

২০২২ সালে কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল তাঁর নিজের মন্ত্রিসভার সদস্যদের গণপদত্যাগ। যদি লেবার মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা একই ধরনের চাপ সৃষ্টি করেন, তাহলে স্টারমারের অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

আর সেখানেই বার্নহ্যামের আসল শক্তি। তিনি এখন এমন অবস্থানে পৌঁছেছেন, যেখান থেকে কার্যত স্টারমারকে বলতে পারেন—আপনি নিজের শর্তে বিদায় নিতে চান, না কি চাপের মুখে?

ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, রাজনৈতিক বার্তা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বার্নহ্যামের জয় শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা।

ব্রিটেনের বহু ভোটার হয়তো এখনও রিফর্ম ইউকের নীতির সঙ্গে একমত নন, কিন্তু তাঁরা বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অসন্তুষ্ট। সেই অসন্তোষকে কে ধারণ করতে পারবেন—সেটাই মূল প্রশ্ন।

মেকারফিল্ডের ফলাফল অন্তত আপাতত বলছে, সেই ব্যক্তি অ্যান্ডি বার্নহ্যাম হতে পারেন। যে নেতা দুইবার লেবার নেতৃত্বের লড়াইয়ে হেরেছিলেন, তিনিই আজ দলের সম্ভাব্য ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। কয়েক মাস আগেও যা ছিল কল্পনা, আজ তা বাস্তব সম্ভাবনা।

ব্রিটিশ রাজনীতিতে তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—কিয়ার স্টারমারের সময় কি সত্যিই শেষ হয়ে এসেছে?

উত্তর মিলতে হয়তো আর বেশি দেরি নেই। আগামী সপ্তাহই নির্ধারণ করতে পারে ব্রিটেনের শাসক দলের ভবিষ্যৎ, এবং সেই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশও।