গবেষণাকেন্দ্রের দু’শো মিটারে আগুন: বোর্নিওয় ওরাংওটানের সঙ্গে পুড়ছে দীর্ঘ স্মৃতিও

যা জানা জরুরি
- পশ্চিম কালিমান্তানের গুনুং পালুং জাতীয় উদ্যানে বৃষ্টি-অরণ্যের ভিতর ক্যাবাং পান্টি গবেষণাকেন্দ্র।
- সেখানে গাছের মাথায় থাকা ওরাংওটানকে অনুসরণ করে প্রতিদিনের খাদ্য, চলাচল, জন্ম ও মাতৃত্ব নথিবদ্ধ হয়েছে তিন দশকের বেশি।
- গত কয়েক দিনে সেই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের একটি উপকেন্দ্র রাংকংয়ের প্রায় দু’শো মিটারের মধ্যে পৌঁছে গেছে দাবানল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পশ্চিম কালিমান্তানের গুনুং পালুং জাতীয় উদ্যানে বৃষ্টি-অরণ্যের ভিতর ক্যাবাং পান্টি গবেষণাকেন্দ্র। সেখানে গাছের মাথায় থাকা ওরাংওটানকে অনুসরণ করে প্রতিদিনের খাদ্য, চলাচল, জন্ম ও মাতৃত্ব নথিবদ্ধ হয়েছে তিন দশকের বেশি। গত কয়েক দিনে সেই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের একটি উপকেন্দ্র রাংকংয়ের প্রায় দু’শো মিটারের মধ্যে পৌঁছে গেছে দাবানল। ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত মাঠের খবর অনুযায়ী, গবেষক, কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দা মিলিয়ে চল্লিশের বেশি মানুষ আগুন ঠেকাতে পরিখা কাটছেন, শুকনো পাতা সরাচ্ছেন এবং ছিটিয়ে দিচ্ছেন অল্প জল। বন বাঁচানোর এই লড়াইয়ে পাইপের দৈর্ঘ্যও এখন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের মতো জরুরি।
গুনুং পালুংয়ে আড়াই হাজারের বেশি বোর্নীয় ওরাংওটান আছে বলে ধারণা করা হয়। গবেষণাকেন্দ্রের আশপাশেই বাস করে কয়েকশো। আগুন থেকে তারা সরে যেতে পারে, কিন্তু অরণ্য টুকরো হয়ে গেলে নিরাপদে যাওয়ার পথ কমে। গাছের ফল, বিশ্রামের বাসা এবং ছানাসহ মায়ের চলাচল—সবই বৃক্ষচ্ছাদের ধারাবাহিকতার উপর নির্ভরশীল। তিন প্রজাতির ওরাংওটানই আন্তর্জাতিকভাবে অতি বিপন্ন; তাই একটি অরণ্যখণ্ড হারানো শুধু কয়েকটি প্রাণীর ঠিকানা বদল নয়।
বর্তমান আগুনের পেছনে দু’টি স্তর আছে। জমি পরিষ্কার করতে ইচ্ছাকৃত আগুন ইন্দোনেশিয়ায় পুরনো সমস্যা। এ বছর শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে যুক্ত দীর্ঘ খরা সেই ছোট আগুনকে দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে। রয়টার্সের উপগ্রহভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর ইন্দোনেশিয়ার দাবানল প্রায় ১ কোটি ৯৭ লক্ষ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমপরিমাণ নিঃসরণ করেছে—সপ্তাহটির বিশ্বব্যাপী দাবানল-নিঃসরণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি এবং মৌসুমি গড়ের প্রায় ২৭৩ শতাংশ উপরে। ১ অগস্ট থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩,৪৪৩টি তাপবিন্দুও শনাক্ত হয়েছে। এগুলি দেশব্যাপী হিসাব; সবটাই গুনুং পালুংয়ের নয়।
ক্যাবাং পান্টির মূল্য শুধু বিরল প্রাণী দেখায় নয়, সময়ের দৈর্ঘ্যে। বোর্নিওর ওরাংওটান মায়ের দুই সন্তানের মাঝের ব্যবধান প্রায় আট বছর হতে পারে—স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে দীর্ঘতম ব্যবধানগুলির একটি। একটি গবেষণা পাঁচ বা দশ বছর চললে তাই একই মায়ের জীবনের অল্প অংশই দেখা যায়। ৩২ বছরের ধারাবাহিক নথি খাদ্যের ওঠানামা, খরা, প্রজনন ও মানুষের চাপের দীর্ঘ সম্পর্ক বুঝতে দেয়। আগুন যন্ত্রপাতি নষ্ট করলে তা ফের কেনা যায়; পরিচিত প্রাণী, বনখণ্ড এবং ভাঙা সময়সারি ফিরিয়ে আনা যায় না।
স্থানীয় দল রাংকংয়ের চারপাশে আগুনরোধী ফাঁক এবং জলছিটানোর ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু পিটসমৃদ্ধ বা শুকনো মাটিতে আগুন উপর থেকে নিভে গিয়েও নিচে জ্বলতে পারে। তাই বড় আকারে জলবর্ষণ ও সরকারি সহায়তা চাওয়া হয়েছে। আবহাওয়াবিদেরা অক্টোবর পর্যন্ত কঠিন আগুন-মৌসুমের আশঙ্কা করছেন। অন্য অঞ্চলেও উদ্ধারকারী দল অগস্টে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি ওরাংওটান সরিয়েছে, যা বিপদের বিস্তার বোঝায়।
ইন্দোনেশিয়ার বনাগুন প্রতিবেশী দেশেও ধোঁয়া পাঠাতে পারে; স্বাস্থ্য, বিমান চলাচল ও বিদ্যালয়ে তার প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে কার্বনসমৃদ্ধ অরণ্য ও পিট পুড়লে জলবায়ু উষ্ণায়ন বাড়ে, যা ভবিষ্যতের খরা ও আগুনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। জমি পরিষ্কারের দায় নির্ধারণ, ছাড়পত্র ও সরবরাহশৃঙ্খল পরীক্ষা তাই আগুন নেভানোর পরের কাজ নয়—প্রতিরোধের অংশ।
সংবাদচিত্রে একটি ওরাংওটানের মুখ সহজে সহানুভূতি টানে; কম দৃশ্যমান ক্ষতি হল গবেষণার স্মৃতি। বহু প্রজন্মের প্রাণীকে চিনে রাখা মাঠকর্মী, তাদের নথি এবং অক্ষত বন মিলেই বিজ্ঞান তৈরি করেছে। আগুন যদি সেই সম্পর্ক ছিন্ন করে, একটি ভবন বাঁচালেই গবেষণাকেন্দ্র বাঁচবে না। জরুরি জলবর্ষণের পাশাপাশি আগুন লাগানোর অর্থনীতি ও জমি ব্যবস্থার জবাবদিহি ছাড়া প্রতি খরাতেই একই মানুষকে একই বন নতুন করে রক্ষা করতে হবে।
আগুনের পরে বেঁচে থাকা বনও বদলায়। ফলদ গাছ নষ্ট হলে ওরাংওটান কৃষিজমি বা বসতির দিকে নামতে পারে, যেখানে সংঘাতের ঝুঁকি বেশি। ধোঁয়া ও খাদ্যাভাবের প্রভাব তাৎক্ষণিক মৃত প্রাণীর হিসাবে ধরা পড়ে না; কয়েক বছর স্বাস্থ্য ও জন্মহার দেখা প্রয়োজন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



