হাইলাইটস:

  • মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, জি–৭ সম্মেলনে তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার জন্য ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি নাকি “অনুরোধ করেছিলেন”।
  • মেলোনি প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে মিথ্যাবাদী বলে আক্রমণ করে বলেছেন, “ইতালি এবং আমি কখনও কারও কাছে ভিক্ষা চাই না।”
  • ইরান যুদ্ধ, পোপ লিও চতুর্দশকে নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য এবং পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে দুই নেতার মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরেই টানাপোড়েন চলছিল।
  • মেলোনির মন্ত্রিসভার সদস্যরা ট্রাম্পের মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন।
  • ইতালির বিরোধীরাও ট্রাম্পের মন্তব্যে ক্ষুব্ধ, যদিও তাঁরা মেলোনির ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ নীতিকেও আক্রমণ করেছেন।

বাংলাস্ফিয়ার: ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের টালমাটাল সম্পর্ক অবশেষে বড়সড় ভাঙনের মুখে পৌঁছেছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই নেতার মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছিল। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইতালির সমর্থন না পাওয়া এবং পোপ লিও চতুর্দশ সম্পর্কে ট্রাম্পের মন্তব্যের সমালোচনা করায় মেলোনির প্রতি প্রকাশ্য অসন্তোষ দেখিয়েছিলেন ট্রাম্প। আর শুক্রবার মেলোনি এমন প্রতিক্রিয়া দিলেন, যাতে বোঝা গেল তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত জি–৭ শীর্ষ সম্মেলনে। বৃহস্পতিবার এক ইতালীয় সাংবাদিককে ট্রাম্প বলেন, মেলোনি তাঁর সঙ্গে একটি ছবি তোলার জন্য নাকি “অনুরোধ করেছিলেন”। ইতালীয় টেলিভিশন সাংবাদিকের প্রকাশিত ইংরেজি প্রতিলিপি অনুযায়ী, ট্রাম্পের দাবি ছিল, মেলোনি তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে এতটাই আগ্রহী ছিলেন যে তিনি কার্যত অনুনয় করেছিলেন।

এর জবাবে শুক্রবার সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় মেলোনি বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্য “সম্পূর্ণ মনগড়া”।

ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “ইতালি এবং আমি কখনও ভিক্ষা চাই না।”

২০২২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মেলোনি নিজেকে সেই ইউরোপীয় নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যার সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক সবচেয়ে ভালো। এমনকি দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি শুরু হওয়ার পরও তিনি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

এই সপ্তাহেই জি–৭ সম্মেলনে রয়টার্সের ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল দুই নেতার কথোপকথন। সেখানে মেলোনি ট্রাম্পকে বলছিলেন, “আমরা তো সবসময়ই বন্ধু ছিলাম।” জবাবে ট্রাম্প রসিকতার সুরে বলেন, তিনি নাকি নিজেকে “পরিত্যক্ত” বলে মনে করেছিলেন। মেলোনি তখন হেসে বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে ট্রাম্পের বক্তব্যে সেই সৌহার্দ্যের কোনও প্রতিফলন দেখা যায়নি। ইতালীয় সংবাদমাধ্যম লা–সেভেনের হোয়াইট হাউস সংবাদদাতাকে তিনি বলেন, “মেলোনি আমার সঙ্গে ছবি তুলতে খুবই আগ্রহী ছিল।”

এরপর আরও কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “আমি আসলে তা করতাম না, কিন্তু ওর জন্য আমার মায়া হয়েছিল!”

শুক্রবার মেলোনির পাল্টা জবাব ছিল অনেক বেশি তীক্ষ্ণ।

ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, “আমি সত্যিই বিস্মিত। আমি বুঝতে পারছি না কেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিজের মিত্রদের সঙ্গে এমন আচরণ করেন। এটাও প্রথমবার নয়। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, পশ্চিমের শত্রুদের প্রতি, আমেরিকার শত্রুদের প্রতি তিনি সেই একই দৃঢ়তা দেখান না। বরং যেসব নেতৃত্বের প্রতি তাঁর আরও কঠোর হওয়া উচিত, তাঁদের প্রতিই তিনি বেশি সহনশীল।”

হোয়াইট হাউস এই মন্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

আসলে ইতালির ভোটারদের একাংশের কাছে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠছিল। সেই কারণে মেলোনি ধীরে ধীরে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন। তবে তিনি সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করতে চাননি।

ইরান যুদ্ধের শুরুতে তিনি ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের সরাসরি নিন্দা করেননি। আবার যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরে হরমুজ প্রণালী পরিষ্কারে ইতালি মাইনসুইপার পাঠাবে বলেও তাঁর সরকার ঘোষণা করেছিল।

কিন্তু ট্রাম্প যখন পোপ লিও চতুর্দশকে আক্রমণ করে বলেন, তিনি “চরম বামপন্থীদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন” এবং “অপরাধ দমনে দুর্বল”, তখন মেলোনি প্রকাশ্যে সেই মন্তব্যের সমালোচনা করেন। যদিও একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, মতপার্থক্য থাকলেও ইতালি ও আমেরিকার জোট অটুট রয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক ‘ছবির অনুরোধ’ বিতর্ক যেন পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত ছিল, যেন মেলোনি কোনও কিশোরী ভক্তের মতো একজন সেলিব্রিটির সঙ্গে সেলফি তুলতে উদ্গ্রীব ছিলেন।

এই মন্তব্যের পর মেলোনির মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য প্রকাশ্যে তাঁর পাশে দাঁড়ান।

ইতালির বিদেশমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা করেন, তিনি মিয়ামিতে একটি ব্যবসায়িক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করছেন।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো লেখেন, “আমি কল্পনাও করতে পারি না যে জর্জিয়া মেলোনি কারও কাছে ছবি চেয়েছেন—হুমকি দিলেও নয়।”

মেলোনির জোটসঙ্গী ও কট্টর দক্ষিণপন্থী নেতা মাত্তেও সালভিনিআরও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “যে জর্জিয়াকে আক্রমণ করে, সে আমাদের সবাইকেই আক্রমণ করে।”

তবে জি–৭ সম্মেলনের ছবি ও ভিডিওতে দুই নেতার মধ্যে প্রকাশ্য কোনও শত্রুতার ইঙ্গিত দেখা যায়নি। ফ্রান্সের এভিয়াঁ শহরের হোটেল রয়্যালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বৈঠকের পর তাঁদের পাশাপাশি বসে থাকতে দেখা যায়। মেলোনিকে হাসিখুশি দেখাচ্ছিল এবং বৈঠক শেষে ট্রাম্পকে তাঁর সঙ্গে উষ্ণ করমর্দন করতেও দেখা যায়।

ট্রাম্পের মন্তব্যে শুধু ইতালির সরকারই নয়, বিদেশি নেতারাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

পেদ্রো সানচেজ মেলোনির প্রতি “পূর্ণ সংহতি” প্রকাশ করেছেন। বেলজিয়ামের প্রতিরক্ষামন্ত্রী থিও ফ্রাঙ্কেন সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “হোয়াইট হাউসের উচিত জর্জিয়া মেলোনিকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া।”

ইতালির বিরোধী দলগুলিও ট্রাম্পের সমালোচনায় সরব হয়েছে।

ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাংসদ লিয়া কোয়ার্তাপেল্লে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রীকে যে মাত্রার অপমান করেছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি নিজেকেই হাস্যকর করে তুলছেন—একজন দাদাগিরি করা নেতা, যিনি ইতালির সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতেও দ্বিধা করেন না।”

তবে বিরোধীরা একই সঙ্গে মেলোনির ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ নীতিকেও বিদ্ধ করেছে।

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মাত্তেও রেনজি লেখেন, “ট্রাম্পের বক্তব্য বরাবরের মতোই ভয়াবহ। অবশেষে প্রেসিডেন্ট মেলোনিও সেটা বুঝতে পেরেছেন। সুপ্রভাত, জর্জিয়া! অবশেষে কি উপলব্ধি করলেন যে ওই ধরনের মানুষের সঙ্গে জোট বাঁধা মানে ইতালির স্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়া?”

তিনি আরও বলেন, “মাগা টুপি পরা বন্ধ হোক, ট্রাম্পের দিকে সেতু বানানো বন্ধ হোক। ইতালি এমন নেতৃত্বের যোগ্য, যাকে বিশ্ব সম্মান করবে।”

সব মিলিয়ে, একসময় যাঁদের সম্পর্ককে ট্রান্স-আটলান্টিক রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তিগত বন্ধুত্বগুলির একটি বলে মনে করা হত, সেই ট্রাম্প–মেলোনি সম্পর্ক এখন প্রকাশ্য বাকযুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছেছে। আর এই সংঘাত শুধু দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, ভবিষ্যতে ইতালি–মার্কিন সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।