আন্দোলন থামতেই আদালতের ধাক্কা

যা জানা জরুরি
- ঝাড়খণ্ডে নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে টানা ২৬ দিনের ছাত্র আন্দোলন প্রত্যাহারের পরদিনই পরিস্থিতি নতুন মোড় নিল।
- হেমন্ত সোরেন সরকারের একাধিক পরীক্ষা ও নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তে আপাতত স্থগিতাদেশ দিল ঝাড়খণ্ড হাই কোর্ট।
- ফলে একাদশ থেকে ত্রয়োদশ ঝাড়খণ্ড সম্মিলিত অসামরিক পরিষেবা পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ৩৪২ জন আধিকারিক আপাতত চাকরিতে বহাল থাকছেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ঝাড়খণ্ডে নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে টানা ২৬ দিনের ছাত্র আন্দোলন প্রত্যাহারের পরদিনই পরিস্থিতি নতুন মোড় নিল। হেমন্ত সোরেন সরকারের একাধিক পরীক্ষা ও নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তে আপাতত স্থগিতাদেশ দিল ঝাড়খণ্ড হাই কোর্ট। ফলে একাদশ থেকে ত্রয়োদশ ঝাড়খণ্ড সম্মিলিত অসামরিক পরিষেবা পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ৩৪২ জন আধিকারিক আপাতত চাকরিতে বহাল থাকছেন।
নিয়োগ বাতিলের সরকারি বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ করে সদ্য নিযুক্ত আধিকারিকেরা হাই কোর্টে একাধিক আবেদন করেছিলেন। তাঁদের যুক্তি, কয়েকজন পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলেই গোটা নির্বাচনপ্রক্রিয়া বাতিল করা যায় না। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আলাদা করে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাছাড়া নিয়োগ বাতিলের আগে সফল প্রার্থীদের বক্তব্য জানানোর সুযোগও দেওয়া হয়নি। বৃহস্পতিবার মামলাগুলির শুনানিতে আদালত সরকারি সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা আপাতত স্থগিত করে।
এই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজ্যের ৩৪২টি প্রশাসনিক পদ পূরণ করা হয়েছিল। প্রাথমিক পরীক্ষায় বসেছিলেন প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ চাকরিপ্রার্থী। তাঁদের মধ্যে ৭,০১১ জন মূল লিখিত পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হন। পরে ৮৬৪ জনকে ব্যক্তিত্ব যাচাই ও সাক্ষাৎকারে ডাকা হয়। শেষ পর্যন্ত ৩৪২ জনকে নিয়োগ করা হয় উপ-সমাহর্তা, পুলিশ উপাধ্যক্ষ, রাজ্য কর আধিকারিক-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে।
সরকারের নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তে এই আধিকারিকদের চাকরি কার্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। আদালতে তাঁদের দাবি, কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের দায়ে নিয়ম মেনে নির্বাচিত সকলকে শাস্তি দেওয়া যায় না। তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে প্রমাণ মিলবে, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু পৃথক তদন্ত ও শুনানি ছাড়া গোটা নির্বাচন বাতিল করা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
সরকারের অবশ্য পাল্টা দাবি, অপরাধ তদন্ত বিভাগ এবং বিশেষ তদন্তকারী দলের প্রাথমিক অনুসন্ধানে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত মিলেছে। সেই ভিত্তিতেই ঝাড়খণ্ড লোকসেবা কমিশন এবং ঝাড়খণ্ড কর্মী নির্বাচন কমিশনের অধীনে হওয়া ২২টি পরীক্ষা ও নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আরও কয়েকটি পরীক্ষা স্থগিত রেখে ২০১৪ সালের পর বেসরকারি সংস্থা টিএসআর ডেটা প্রসেসিং লিমিটেড পরিচালিত পরীক্ষাগুলিও তদন্তের আওতায় আনা হয়।
বাতিল হওয়া পরীক্ষার তালিকাও ছিল দীর্ঘ। সম্মিলিত স্নাতক স্তরের পরীক্ষা ছাড়াও ওষুধ পরিদর্শক, সহকারী অধ্যাপক, দন্তচিকিৎসক, সহকারী বাস্তুকার, অসামরিক বিচারক, অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি, বনাঞ্চল আধিকারিক এবং সরকারি পলিটেকনিকের শিক্ষক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও তার মধ্যে ছিল। এর ফলে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেওয়া প্রায় ২,৬০০ কর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বৃহস্পতিবারের নির্দেশ অবশ্য মূলত অসামরিক পরিষেবা পরীক্ষা এবং আদালতের সামনে আসা সংশ্লিষ্ট নিয়োগগুলির ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দিয়েছে। ৫৬ জন খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিকের নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তেও স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস, ফল প্রকাশে অনিয়ম এবং বেসরকারি সংস্থাকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রায় এক মাস ধরে আন্দোলনে নেমেছিলেন চাকরিপ্রার্থীরা। রাঁচিতে অনশন, বিধানসভা অভিযান এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর সরকার একাধিক পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। আন্দোলনকারীরা সেটিকে প্রাথমিক জয় হিসেবে দেখেছিলেন এবং ৬০ দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করেছিলেন।
কিন্তু আন্দোলন থামার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হাই কোর্টের নির্দেশে সরকারের সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আটকে গেল। ফলে আন্দোলনকারীদের মধ্যেও নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাঁদের একাংশের অভিযোগ, পরীক্ষা বাতিলের পক্ষে সরকার আদালতে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরতে পারেনি। নিয়োগে অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তির দাবিতে ফের আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তাঁরা।
অন্য দিকে, আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশে আপাতত স্বস্তি পেয়েছেন চাকরিতে যোগ দেওয়া আধিকারিকেরা। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা তদন্তের বিরোধিতা করছেন না; আপত্তি গোটা নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে একসঙ্গে বাতিল করার বিরুদ্ধে। তাঁদের মতে, প্রমাণিত অনিয়মের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হোক, কিন্তু সৎ পথে নির্বাচিত প্রার্থীদের যেন তার দায় নিতে না হয়।
তবে আদালতের এই নির্দেশই চূড়ান্ত রায় নয়। মূল মামলার শুনানিতে সরকারকে ব্যাখ্যা করতে হবে—অনিয়মের প্রমাণ কতটা নির্ভরযোগ্য, তার পরিধি কতটা এবং কেন গোটা নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিল করা আইনসঙ্গত বলে মনে করা হয়েছিল।
অর্থাৎ, ঝাড়খণ্ডে ছাত্র আন্দোলন আপাতত থেমেছে ঠিকই, কিন্তু নিয়োগ-বিতর্ক থামেনি। রাজপথ থেকে লড়াই এবার আদালতের এজলাসে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



