নাকাশিপাড়ায় জোড়া খুন: গুলির পর কোপ, ধৃত তৃণমূল প্রধান-সহ ৩

যা জানা জরুরি
- স্বাধীনতা দিবসের রাতেই নদিয়ার নাকাশিপাড়ায় ভয়াবহ জোড়া খুন।
- বাড়ি ফেরার পথে গাড়ি আটকে কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান ও তাঁর আইনজীবী পুত্র আবু সুফিয়ানকে প্রথমে গুলি, পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুনের অভিযোগ…
- ঘটনায় তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই হরনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান ফতিমা বিবি-সহ তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
স্বাধীনতা দিবসের রাতেই নদিয়ার নাকাশিপাড়ায় ভয়াবহ জোড়া খুন। বাড়ি ফেরার পথে গাড়ি আটকে কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান ও তাঁর আইনজীবী পুত্র আবু সুফিয়ানকে প্রথমে গুলি, পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুনের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনায় তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই হরনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান ফতিমা বিবি-সহ তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃত অন্য দু’জন সাহেব শেখ ও মিঠু শেখ। কৃষ্ণনগর আদালত তাঁদের ন’দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, বর্তমানে জেলবন্দি ফতিমার স্বামী জব্বর শেখই এই হত্যাকাণ্ডের মূলচক্রী বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে খুনের সঠিক কারণ, হামলায় কত জন জড়িত এবং গোটা ষড়যন্ত্রের পরিধি এখনও স্পষ্ট নয়। জেলবন্দি জব্বর কী ভাবে বাইরে থাকা দুষ্কৃতীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, কারা তাঁকে সাহায্য করেছিল এবং অস্ত্র কোথা থেকে এসেছিল—সবই খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
৫০ বছর বয়সি আনিসুর রহমান প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সদস্য এবং নদিয়া জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। নাকাশিপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন তিনি। তাঁর ২৪ বছরের ছেলে আবু সুফিয়ান কৃষ্ণনগর আদালতে আইনজীবী হিসেবে কাজ করতেন।
শনিবার রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ বেথুয়াডহরি থেকে গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছিলেন বাবা-ছেলে। বাড়ি থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে নাগাদি রেলগেটের কাছে তাঁদের গাড়ির পথ আটকায় দুষ্কৃতীরা। অভিযোগ, প্রথমে গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এরপর আনিসুর ও সুফিয়ানকে গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই দু’জনের মৃত্যু হয়।
হামলায় ঠিক কতগুলি গুলি চালানো হয়েছিল বা কত জন সরাসরি অংশ নিয়েছিল, তা এখনও নিশ্চিত নয়। নদিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুরজিৎ কুমার দে জানিয়েছেন, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করতে তদন্ত চলছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, ধৃতদের মোবাইল ফোন এবং সাম্প্রতিক গতিবিধিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাকি অভিযুক্তদের সন্ধানেও তল্লাশি চলছে।
ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, জেলা পুলিশ তাঁকে জানিয়েছে—জেলবন্দি জব্বর শেখই হত্যার পিছনে রয়েছেন। তাঁর স্ত্রী তথা তৃণমূল পরিচালিত পঞ্চায়েতের প্রধানকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, “তৃণমূলের লোকেরাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু আইনের শাসন সকলের জন্য সমান।” যদিও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা তৃণমূলের সরাসরি যোগের বিষয়ে পুলিশ এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও সিদ্ধান্ত জানায়নি।
স্থানীয় কংগ্রেস নেতা টিপু সুলতানের অভিযোগ, এলাকায় নিজের প্রভাব অটুট রাখতেই জেল থেকে দুষ্কৃতীদের কাজে লাগিয়ে খুনের ছক কষেছিলেন জব্বর। নিরপেক্ষ তদন্ত হলেই পুরো ষড়যন্ত্র প্রকাশ্যে আসবে বলে দাবি তাঁর।
প্রাক্তন সাংসদ অধীররঞ্জন চৌধুরীও ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। স্বাধীনতা দিবসের রাতে এমন নৃশংসতা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং স্বাধীন ভাবে রাজনীতি করার অধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার ও কঠোর শাস্তির পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অধীর।
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার হত্যার প্রতিবাদে ‘কালা দিবস’ পালন করেন। তাঁর দাবি, আনিসুরকে সরিয়ে দেওয়ার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। তাঁর অভিযোগ, নদিয়ার কয়েক জন পঞ্চায়েত সদস্য কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার জন্য আনিসুরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। সেই দলবদল ঠেকাতেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই ঘটনায় বিজেপির স্বার্থ জড়িত থাকার অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
অর্থাৎ, তদন্তের মাঝেই সামনে এসেছে একাধিক রাজনৈতিক দাবি—মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ তৃণমূলের দিকেই, কংগ্রেসের অভিযোগের তির আবার অন্য দিকে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক তত্ত্বই তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। পুলিশের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, রাজনৈতিক চাপের বাইরে গিয়ে হত্যার প্রকৃত কারণ ও নেপথ্যের গোটা নেটওয়ার্ক সামনে আনা।
আর জব্বর শেখই যদি সত্যিই জেল থেকে এই হত্যার ছক কষে থাকেন, তা হলে প্রশ্ন উঠছে কারাগারের ভিতর থেকে বন্দির যোগাযোগব্যবস্থা নিয়েও।
স্বাধীনতা দিবসের রাতে বাড়ির কয়েকশো মিটারের মধ্যে এক রাজনৈতিক নেতা ও তাঁর তরুণ আইনজীবী ছেলেকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাতে নাকাশিপাড়ায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। তিন জনের গ্রেফতার তদন্তের প্রথম ধাপ মাত্র—হামলায় সরাসরি জড়িত প্রত্যেককে গ্রেফতার করা এবং এই রক্তাক্ত হামলার নেপথ্যের আসল কারণ খুঁজে বের করাই এখন পুলিশের বড় পরীক্ষা।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



