Table of Contents
চার বছর পর ফের আদালতে দাঁড়িয়ে সেই দিনের বিভীষিকাময় স্মৃতি তুলে ধরলেন বিশ্বখ্যাত লেখক সালমান রুশদি। নিউইয়র্কের বাফেলো ফেডারেল আদালতে সন্ত্রাসবাদ মামলার শুনানিতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি বললেন, হামলার প্রথম মুহূর্তে তিনি বুঝতেই পারেননি যে তাঁকে ছুরি মারা হয়েছে।
মনে হয়েছিল, কেউ যেন থুতনির নিচে ঘুষি মেরেছে।
তারপরই সবকিছু বদলে যায়।
রুশদি আদালতে জানান, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি মঞ্চে লুটিয়ে পড়েন। আর জ্ঞান ফেরার পর চারপাশে দেখতে পান রক্ত।
“আমি মঞ্চে পড়ে ছিলাম। আমার চারপাশে বিশাল এক রক্তের হ্রদ তৈরি হয়েছিল। এত রক্ত আমি জীবনে কখনও দেখিনি,” আদালতে বলেন তিনি।
জুরি সদস্যরা গভীর মনোযোগ দিয়ে তাঁর সাক্ষ্য শোনেন। এক পর্যায়ে রুশদি নিজের চশমা খুলে ডান চোখের ক্ষতও দেখান। ২০২২ সালের সেই হামলায় তিনি ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। শরীরের একাধিক অংশে গুরুতর আঘাতও পান।
আদালতকক্ষে উপস্থিত ছিলেন অভিযুক্ত হাদি মাতারও। রুশদির মুখোমুখি বসেই তিনি লেখকের সাক্ষ্য শোনেন। মাতার অবশ্য মামলায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
মঞ্চে উঠে এসেছিল হামলাকারী
ঘটনাটি ঘটে ২০২২ সালের আগস্টে। নিউইয়র্কের শটাকোয়া ইনস্টিটিউটে বক্তব্য রাখতে মঞ্চে ওঠার ঠিক আগের মুহূর্তে রুশদির উপর হামলা চালানো হয়।
দর্শকদের চোখের সামনেই এক ব্যক্তি ছুরি নিয়ে মঞ্চে উঠে তাঁর উপর একের পর এক আঘাত হানেন।
গুরুতর জখম অবস্থায় রুশদিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের পর ধীরে ধীরে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করেন।
এর আগে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের মামলায় হাদি মাতারকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এবার ফেডারেল আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত অভিযোগের বিচার চলছে।
হামলার সঙ্গে খোমেনির ফতোয়ার যোগ?
মার্কিন ফেডারেল প্রসিকিউটরদের দাবি, এই হামলা কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত আক্রমণ ছিল না। তাঁদের বক্তব্য, এটি ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির জারি করা ফতোয়ার ধারাবাহিকতার অংশ।
সেই ফতোয়ায় রুশদির মৃত্যুদণ্ডের আহ্বান জানানো হয়েছিল তাঁর বিতর্কিত উপন্যাস ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ প্রকাশের পর।
১৯৮৮ সালে প্রকাশিত উপন্যাসটি মুসলিম বিশ্বের একাংশে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। পরের বছর ফতোয়া জারির পর বহু বছর আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হন রুশদি। ব্রিটিশ সরকারের নিরাপত্তা সুরক্ষায় দীর্ঘ সময় কাটানোর পর ধীরে ধীরে তিনি জনজীবনে ফিরলেও তাঁর বিরুদ্ধে হুমকি কখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
প্রসিকিউশনের দাবি, মাতার ওই ফতোয়া দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই হামলা চালান।
তবে প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, প্রসিকিউশন ঘটনাটিকে রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত করছে।
শুধু হামলার বিচার নয়
রুশদির সাক্ষ্য এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, হামলার শিকার ব্যক্তি নিজেই আদালতে দাঁড়িয়ে সেই দিনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
তবে এই বিচার কেবল একজন লেখকের উপর হামলার বিচার নয়।
এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাহিত্যচর্চা, ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
একজন লেখক বিতর্কিত কিছু লিখলে তার পরিণতি কি হুমকি, আত্মগোপন এবং মৃত্যুভয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে?
নাকি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারকে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে?
সালমান রুশদির সাক্ষ্য সেই পুরনো প্রশ্নগুলিকেই আবার আদালতের সামনে ফিরিয়ে এনেছে।
চার বছর পরও সেই মঞ্চের রক্ত শুকিয়ে যায়নি—অন্তত স্মৃতিতে নয়।