‘বিজয়ের মাসেই’ দেশে ফেরার ঘোষণা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর; ভারতে প্রকাশ্য ভাষণের অনুমতি ঘিরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে বাড়ল অস্বস্তি
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন, আগামী ডিসেম্বরে, অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ‘বিজয়ের মাসেই’ তিনি দেশে ফিরতে চান। ভারতে অবস্থান করে এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, গ্রেপ্তার বা মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা থাকলেও দেশে ফিরবেন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “ভয় আমাকে থামাতে পারবে না।”
নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া (FCCSA)-র আয়োজিত অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের প্রতীক। তাই সেই মাসেই তিনি দেশে ফিরে জনগণের পাশে দাঁড়াতে চান। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা মামলাগুলি প্রত্যাহারের দাবিও জানান।
বর্তমানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের ঘটনায় গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে হাসিনা শুরু থেকেই এই বিচারকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ বলে দাবি করে আসছেন।
হাসিনার এই ঘোষণার পরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ঢাকা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ভারতে অবস্থানরত একজন দণ্ডিত ও পলাতক ব্যক্তিকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক নয়। তারা এই ঘটনায় ‘গভীর দুঃখ ও হতাশা’ প্রকাশ করে এবং জানায়, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও বিচারব্যবস্থার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
এর আগেও বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছিল যে, শেখ হাসিনার প্রকাশ্য রাজনৈতিক ভাষণ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
তবে এই বিতর্কে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করেছে নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক স্পষ্ট জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছে এবং সেখানে ব্যক্ত হওয়া মতামতের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনও সম্পর্ক নেই।
বক্তৃতায় শেখ হাসিনা আরও দাবি করেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চলছে এবং দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসন গভীর সংকটের মুখে। তাঁর বক্তব্য, জনগণের স্বার্থেই তাঁকে দেশে ফিরতে হবে এবং প্রয়োজনে আদালতের মুখোমুখিও তিনি হবেন।
অন্যদিকে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার হাসিনার সব অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছে। সরকারের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের কাছে করা প্রত্যর্পণের আবেদন এখনও বহাল রয়েছে।
তাৎপর্যপূর্ণভাবে, হাসিনার এই প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা এসেছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির প্রেক্ষাপটে। ঢাকায় সেই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য একটি জাদুঘরও উদ্বোধন করা হয়েছে। ফলে একদিকে গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি, অন্যদিকে হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফের তীব্র বিতর্ক, মেরুকরণ এবং ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন অস্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছে।