হাইলাইটস:

  • পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে প্রায় ৩২ লক্ষ মামলা এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
  • বর্তমান গতিতে চললে সব মামলা শেষ হতে সময় লাগতে পারে প্রায় ২১ বছর—এমনই পর্যবেক্ষণ আদালতের।
  • বিচারকের শূন্যপদ, পরিকাঠামোর অভাব ও প্রশাসনিক জটকে সংকটের মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
  • সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ।
  • আদালত দ্রুত বিচারক নিয়োগ ও ট্রাইব্যুনালগুলিকে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের ট্রাইব্যুনালগুলিতে বিচারব্যবস্থার চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে জমে থাকা মামলার সংখ্যা প্রায় ৩২ লক্ষ। বর্তমান নিষ্পত্তির হার অব্যাহত থাকলে এই বিপুল মামলার নিষ্পত্তি করতে প্রায় ২১ বছর সময় লাগতে পারে বলে আদালত মন্তব্য করেছে। এই পর্যবেক্ষণ শুধু বিচারব্যবস্থার ধীরগতিকেই তুলে ধরেনি, বরং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কতটা বিপন্ন হয়ে পড়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।

মামলাটি শুনানির সময় আদালতের সামনে রাজ্য সরকারের দেওয়া তথ্যেই উঠে আসে, বিপুল সংখ্যক মামলা বছরের পর বছর ধরে ঝুলে রয়েছে। অনেক ট্রাইব্যুনালে বিচারকের পদ দীর্ঘদিন খালি। কোথাও পর্যাপ্ত সদস্য নেই, কোথাও আবার প্রয়োজনীয় কর্মী ও অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। ফলে নতুন মামলা যেমন জমছে, পুরনো মামলার নিষ্পত্তিও অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, ট্রাইব্যুনাল গঠন করার উদ্দেশ্যই ছিল দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। বরং বহু ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল নিজেই বিলম্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এতে নাগরিকদের আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক ক্ষতি বাড়ছে।

বিচারপতিরা পর্যবেক্ষণে বলেন, যদি বর্তমান গতিতেই মামলা নিষ্পত্তি চলতে থাকে, তাহলে আজ যে ব্যক্তি মামলা দায়ের করছেন, তাঁর জীবদ্দশায় রায় পাওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। বিচার পেতে দুই দশকের বেশি সময় অপেক্ষা করা কোনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাইব্যুনালের উপর নির্ভর করে চাকরি, জমি, কর, পরিষেবা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের নিষ্পত্তি হয়। ফলে এই স্তরে দীর্ঘসূত্রিতা শুধু মামলাকারীদের নয়, প্রশাসন ও অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করে। বহু সরকারি প্রকল্প এবং নিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও বছরের পর বছর আটকে থাকে।

আদালত আরও জানিয়েছে, শুধুমাত্র নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিদ্যমান ট্রাইব্যুনালগুলিতে দ্রুত বিচারক ও সদস্য নিয়োগ, পর্যাপ্ত কর্মী নিয়োগ, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিয়মিত শুনানি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

এছাড়া মামলার সংখ্যা কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর শুনানি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের উপরও জোর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আদালতের মতে, বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে হলে দীর্ঘসূত্রিতা কমানো ছাড়া অন্য কোনও পথ নেই।

আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই কার্যত বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া। কারণ দীর্ঘ অপেক্ষার ফলে প্রমাণ নষ্ট হয়, সাক্ষীর স্মৃতি ম্লান হয়, অনেক ক্ষেত্রে মামলাকারী বা সাক্ষী আর বেঁচেও থাকেন না। ফলে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।

এই পরিস্থিতিতে আদালতের কড়া পর্যবেক্ষণ রাজ্য প্রশাসনের উপর চাপ বাড়াল। দ্রুত শূন্যপদ পূরণ, ট্রাইব্যুনালগুলিকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে। কারণ ৩২ লক্ষ মামলার পাহাড় এবং ২১ বছরের সম্ভাব্য অপেক্ষা শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের ন্যায়বিচারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রতিচ্ছবি।