ইনস্টার সূত্রে শাপলা!

যা জানা জরুরি
- ইনস্টাগ্রামের একটি ছবি ধরে কলম্বিয়ার গভীর জঙ্গলে নতুন দৈত্যাকার শাপলার খোঁজ পেলেন গবেষকেরা।
- মহাকাশ থেকেও দৃশ্যমান এই উদ্ভিদের প্রজাতিতে টিকে রয়েছে মাত্র ৩০–৫০টি গাছ, আশঙ্কা বিলুপ্তির একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট।
- তাতেই চোখ আটকে গিয়েছিল উদ্ভিদবিশেষজ্ঞ কার্লোস মাগদালেনার।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ইনস্টাগ্রামের একটি ছবি ধরে কলম্বিয়ার গভীর জঙ্গলে নতুন দৈত্যাকার শাপলার খোঁজ পেলেন গবেষকেরা। মহাকাশ থেকেও দৃশ্যমান এই উদ্ভিদের প্রজাতিতে টিকে রয়েছে মাত্র ৩০–৫০টি গাছ, আশঙ্কা বিলুপ্তির
একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট। তাতেই চোখ আটকে গিয়েছিল উদ্ভিদবিশেষজ্ঞ কার্লোস মাগদালেনার। ছবিতে দেখা যাচ্ছিল, কলম্বিয়ার ইনিরিদা নদীতে দৈত্যাকার শাপলার মাঝে সাঁতার কাটছেন এক ব্যক্তি। ছবিটি যে শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানের অজানা এক প্রজাতির সন্ধান দেবে, তা তখনও জানতেন না কেউ। সেই সূত্র ধরেই কয়েক বছরের অনুসন্ধান, উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ এবং পাঁচ দিনের দুর্গম অভিযান। অবশেষে কলম্বিয়ার গভীর বর্ষাবনে মিলল দৈত্যাকার শাপলার এক নতুন প্রজাতি—‘ভিক্টোরিয়া কলম্বিয়ানা’। কিন্তু আবিষ্কারের আনন্দের মধ্যেই উদ্বেগ, প্রকৃতিতে টিকে রয়েছে এর মাত্র ৩০ থেকে ৫০টি গাছ!
আকারে এই শাপলা এতটাই বড় যে মহাকাশ থেকেও দেখা সম্ভব। এর পাতার ব্যাস হতে পারে তিন মিটার পর্যন্ত, যা একটি ছোট শিশুর ওজনও বহন করতে পারে। পৃথিবীতে এখনও টিকে থাকা প্রাচীনতম সপুষ্পক উদ্ভিদগুলির অন্যতম দৈত্যাকার শাপলা। মহাদেশগুলি পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ারও আগে থেকে এদের অস্তিত্ব রয়েছে। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে চিত্রশিল্পী ক্লদ মোনের ছবিতেও শাপলার উপস্থিতি দেখা যায়।
ইনস্টাগ্রাম থেকে জঙ্গলের গভীরে
ঘটনার শুরু তিন বছর আগে। লন্ডনের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন্স, কিউ-এর শাপলা-বিশেষজ্ঞ মাগদালেনা সমাজমাধ্যমে ছবিটি দেখতে পান। ছবিটি তুলেছিলেন আমেরিকায় মাংসাশী উদ্ভিদের একটি নার্সারি চালানো জেরেমায়া হ্যারিস। শাপলাগুলির মধ্যে সাঁতার কাটতে থাকা এক ব্যক্তির ছবির গুরুত্ব প্রথমে বুঝতে পারেননি তিনি। উদ্ভিদটিকে তুলনায় পরিচিত ‘ভিক্টোরিয়া অ্যামাজোনিকা’ প্রজাতি বলে ভুল করেছিলেন।
কিন্তু মাগদালেনার সন্দেহ হয়। কারণ, ভিক্টোরিয়া অ্যামাজোনিকা যে অঞ্চলে প্রাকৃতিক ভাবে জন্মায়, তার মধ্যে ইনিরিদা নদী পড়ে না। ছবিটি ঠিক কোথায় তোলা হয়েছিল, তা জানতে হ্যারিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। শুরু হয় অনুসন্ধান। উপগ্রহচিত্র খতিয়ে দেখা, অভিযানের অনুমতি জোগাড় করা এবং অর্থের ব্যবস্থা করতে কেটে যায় কয়েক বছর।
শেষ পর্যন্ত বোগোতার উদ্ভিদ উদ্যানের একটি দল এবং স্থানীয় আদিবাসী সংরক্ষিত এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে বর্ষাবনের গভীরে অভিযান চালান মাগদালেনা। লক্ষ্য একটাই—ছবিতে দেখা শাপলাগুলিকে খুঁজে বের করা।
প্রথম কয়েক দিন জলমগ্ন জঙ্গলে ঘুরেও কোনও সন্ধান মেলেনি। অভিযান প্রায় ব্যর্থ হতে চলেছে। ফেরার উড়ান ধরতে তখন আর মাত্র ১০ ঘণ্টা বাকি। ঠিক সেই সময়ে তাঁদের চালক একটি সম্ভাব্য জায়গার কথা জানান। ঘুটঘুটে অন্ধকারে রাতভর নৌকায় পাড়ি দিয়ে দলটি পৌঁছয় বর্ষাবনের গভীরে একটি ছোট হ্রদে। সেখানেই মেলে কাঙ্ক্ষিত শাপলার গুচ্ছ।
মাগদালেনার কথায়, “এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম যে চোখে জল এসে গিয়েছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে থেকে যাবে, এমনই একটি মুহূর্ত ছিল সেটা।”
তিনি আরও বলেন, “দৈত্যাকার শাপলা ধীরে ধীরে তাদের গোপন কথা প্রকাশ করে। ব্যাপারটা অসাধারণ। আমরা মনে করি, সবই জানি। কিন্তু বাস্তব হল, আমরা সব জানি না। এখনও অনেক কিছু আবিষ্কার করা এবং রক্ষা করা বাকি।”
বিজ্ঞানের খাতায় নতুন নাম
প্রজাতিটির পরিচয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করেন গবেষকেরা। শুক্রবার ‘ফাইটোট্যাক্সা’ পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণাপত্রে জানানো হয়েছে, ভিক্টোরিয়া কলম্বিয়ানা বিজ্ঞানের কাছে একটি নতুন প্রজাতি। এর আগে দৈত্যাকার শাপলার মাত্র তিনটি প্রজাতির কথা জানা ছিল।
গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক হ্যারিসের কাছে এই আবিষ্কার কার্যত অবিশ্বাস্য। গাছপালার সঙ্গে সেলফি তোলার অভ্যাস নিয়ে বন্ধুরা তাঁকে বরাবরই ঠাট্টা করতেন। অথচ সেই ছবি তোলার নেশাই যে একদিন নতুন প্রজাতির সন্ধানে সাহায্য করবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি। তাঁর কথায়, “আমি ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম।”
মাগদালেনার মতে, এই আবিষ্কারের বিশেষত্ব হল, সমাজমাধ্যম ও প্রযুক্তির সাহায্যে আদিবাসীদের জ্ঞান এবং উদ্যানচর্চার অভিজ্ঞতা এক জায়গায় মিলেছে। তার ফলেই উদ্ভিদবিদ্যায় এমন একটি সাফল্য সম্ভব হয়েছে।
উদ্ভিদটির নমুনা বিশ্লেষণ করেছেন শ্রেণিবিন্যাস-বিশেষজ্ঞ মার্টেন ক্রিস্টেনহুস। তাঁর বক্তব্য, নতুন প্রজাতির সন্ধান নিয়মিতই মেলে। কিন্তু ভিক্টোরিয়া কলম্বিয়ানার মতো “এত বড়, এত দর্শনীয় এবং এত প্রতীকী তাৎপর্যপূর্ণ” উদ্ভিদ খুব কমই দেখা যায়।
তিনি বলেন, “এই নতুন দৈত্যাকার শাপলাকে এমনকি মহাকাশ থেকেও দেখা যায়। আমাদের গ্রহের প্রাণজগৎ সম্পর্কে এখনও কত কিছু অজানা, তা এই আবিষ্কার জোরালো ভাবে মনে করিয়ে দেয়।”
আবিষ্কারেই কি বিলুপ্তির আশঙ্কা?
নতুন প্রজাতির সন্ধান উদ্ভিদবিদদের কাছে বড় সাফল্য হলেও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ যথেষ্ট। গবেষকদের অনুমান, প্রাকৃতিক পরিবেশে ভিক্টোরিয়া কলম্বিয়ানার মাত্র ৩০ থেকে ৫০টি গাছ রয়েছে। ফলে প্রজাতিটি অত্যন্ত বিরল এবং বিলুপ্তির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার বা আইইউসিএন-এর লাল তালিকায় প্রজাতিটির বিপন্নতার অবস্থা আনুষ্ঠানিক ভাবে নথিভুক্ত করানোর চেষ্টা করছেন গবেষকেরা।
পাশাপাশি, শাপলাটিকে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করার পরিকল্পনাও চলছে। আদিবাসী সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে তুলনায় সহজে পৌঁছনো যায়, এমন কোনও হ্রদে উদ্ভিদটিকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লক্ষ্য, সেখানে শাপলাটি যাতে স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে উঠতে ও বংশবিস্তার করতে পারে।
গবেষকেরা বীজ সংগ্রহের চেষ্টাও চালিয়ে যেতে চান। সেই বীজ থেকে বোগোতায় শাপলাটির চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে লন্ডনের কিউ গার্ডেন্সেও দেখা যেতে পারে এই নতুন প্রজাতিকে।
ইনস্টাগ্রামের একটি ছবি যে বিজ্ঞানের নতুন দরজা খুলে দিতে পারে, ভিক্টোরিয়া কলম্বিয়ানার আবিষ্কার তারই নজির। তবে এই আবিষ্কার একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিচ্ছে, পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের কতখানি এখনও অজানা—আর সেই অজানা সম্পদের কতটাই বা ইতিমধ্যে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



