সংস্কৃতি ও বিনোদন

কাঠগড়ায় ‘নিও’

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • অন্তরা হালদারের ‘এভরিম্যান’ অর্থনীতির প্রচলিত যুক্তিবাদী মানুষটির বিরুদ্ধে এক রূপক অভিযোগপত্র—যে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতার বৃত্তেই আটকে থাকে।
  • এই ‘যুক্তিবাদী’ মানুষের বিশ্বাস, প্রত্যেকে যদি তার মতো আচরণ করে, তবে সমন্বয়ের এক অলৌকিক কেরামতিতে তা জনকল্যাণ এবং অপরিমেয় সমৃদ্ধি এনে দেবে।
  • কিন্তু তার বিভিন্ন অবতারের মধ্যে পৌরুষের দম্ভও কম নেই।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

অন্তরা হালদারের ‘এভরিম্যান’ অর্থনীতির প্রচলিত যুক্তিবাদী মানুষটির বিরুদ্ধে এক রূপক অভিযোগপত্র—যে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতার বৃত্তেই আটকে থাকে।

এই ‘যুক্তিবাদী’ মানুষের বিশ্বাস, প্রত্যেকে যদি তার মতো আচরণ করে, তবে সমন্বয়ের এক অলৌকিক কেরামতিতে তা জনকল্যাণ এবং অপরিমেয় সমৃদ্ধি এনে দেবে। কিন্তু তার বিভিন্ন অবতারের মধ্যে পৌরুষের দম্ভও কম নেই।

একজনের নাম ফিন—অর্থলগ্নির দুনিয়ার দাপুটে যুবক। টাকার ক্ষমতায় সে যেমন নিজের জগৎ তৈরি করে, তেমনই প্রয়োজনে সেটি ভেঙেও দেয়। আর এক জন ‘দাভোস ম্যান’, যে অর্থনীতির দরজা খুলতে গিয়ে ভিতরের কাঠামোটাই ওলটপালট করে ফেলে। কিংবা টেক—যে বিশ্বাস করে, সীমাহীন প্রযুক্তি আর সীমাহীন পুঁজি একসঙ্গে মিলে নতুন এক মানবজাতির জন্ম দিতে পারে।

তাঁদের সবারই আস্থা এক জায়গায়—বাজার শেষ পর্যন্ত এই বিচিত্র পৌরুষদম্ভগুলির মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে দেবে।

ফলও নাকি হবে অপরিসীম জনকল্যাণ। কিন্তু বাস্তবে যে পৃথিবী তৈরি হয়, তা ডারউইনীয় প্রতিযোগিতার পৃথিবী—কেউ জেতে, কেউ হারে। পরাজিতেরা রাষ্ট্রের সাহায্য চাইতে পারে, বিজয়ীদের ক্ষমতায় ক্ষুব্ধ হতে পারে, এমনকি সাম্যের দাবিতে রাস্তায় নামতে পারে। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গিতে তারা আসলে মানবজাতির অগ্রগতির পথে দাঁড়ানো কিছু ‘ঘ্যানঘ্যানে অভিযোগকারী’ মাত্র।

এ বার উল্টো চরিত্রটির কথা ভাবুন। এমন এক ‘এভরিম্যান’, যে মনে করে মানুষ আসলে আরও জটিল—সে পুরোপুরি যুক্তিনির্ভর নয়, তার আচরণ নানা মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাবের অধীন, তার কাজের প্রেরণাও একমুখী নয়। সর্বোপরি, মানুষ কিছুটা বেশি সহৃদয় এবং সহযোগিতাপ্রবণ।

সব কিছুরই যে দাম থাকতে হবে, এমন নয়। গ্ল্যাডিয়েটরের মতো মরণপণ প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতা সমাজের জন্য আরও বেশি সম্পদ এবং একটি উন্নততর ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। আর একটু সাম্য চাওয়া ঘ্যানঘ্যানানি নয়, ন্যায়বিচারের দাবি।

বাস্তব পৃথিবীর এক মনস্তাত্ত্বিক নাটকে এই চরিত্রগুলি যদি মুখোমুখি হয়? সামাজিক তত্ত্বগুলি যদি চরিত্রের রূপ নিয়ে হাজির হয় শিল্পহ্রাস থেকে অর্থনৈতিক মহামন্দার মতো ঐতিহাসিক সংকটে? তা হলে যে রূপককাহিনি তৈরি হবে, তার সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়।

মোটের উপর, এটাই কেমব্রিজের অর্থনীতিবিদ অন্তরা হালদারের মনোগ্রাহী বই ‘এভরিম্যান: দ্য স্টোরি অব ইকনমিক্স ইন থ্রি অ্যাক্টস’-এর মূল ভাবনা। খানিকটা ভাবনার ইতিহাস, খানিকটা রূপকথা—এই দুইয়ের মিশেলে লেখা বইটি অর্থনীতির বিরুদ্ধে এক ধরনের অভিযোগপত্র হয়ে উঠতে চায়। অভিযোগ সেই ‘নিও’-র বিরুদ্ধে, যে নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই গোটা পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করতে চায়।

নিজেদের তৈরি ‘নিও’

জেরেমি বেন্থাম সম্পর্কে জন স্টুয়ার্ট মিলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি ছিল। টমাস কার্লাইলের স্মরণীয় বাক্যবন্ধ ধার করে তিনি বেন্থামের মধ্যে দেখেছিলেন ‘সীমাবদ্ধ মানুষের পরিপূর্ণতা’। তাঁর দ্বিতীয় আপত্তি আরও তাৎপর্যপূর্ণ: প্রত্যেকে যদি ধরে নেয় যে অন্য সকলে কেবল নিজের স্বার্থই দেখে, তা হলে একসময় সত্যিই সবাই নিছক স্বার্থপর হয়ে উঠতে পারে। নিজেদের তৈরি ধারণাই তখন নিজেদের সত্য করে তোলে।

হালদারের রূপককাহিনির ভিতেও রয়েছে এই ভাবনা।

নিও মানুষের প্রকৃতির সরাসরি প্রতিচ্ছবি নয়। সে এমন এক নির্মাণ, যাকে আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি এবং নিজেদের মতো করে গড়ে ওঠার ক্ষমতাও দিয়েছি। নিও পুরোপুরি খলনায়কও নয়; তার মধ্যে ট্র্যাজিক ছায়াও আছে।

একটি চরিত্র যেমন তাকে বলে, তুমি ‘স্টার ট্রেক’-এর স্পকের মতো, আর আমরা ‘দ্য সিম্পসনস’-এর হোমার সিম্পসনের মতো। কিন্তু যুক্তির মূর্ত প্রতীক হয়েও সেই আদর্শ মেনে বেঁচে থাকা যে নিওর পক্ষেও সব সময় সহজ নয়, সে কথাও স্বীকার করতে হয়।

তবে সহানুভূতির জায়গাটা সেখানেই প্রায় শেষ।

নিও নিজের আধিপত্য ক্রমাগত বিস্তার করতে চায়। অথচ জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তা, অসাম্য, পরিবেশ ধ্বংস কিংবা অর্থনৈতিক অস্থিরতার মতো গভীর সমস্যাগুলির সামনে তার উত্তর প্রায় নেই। তার বিভ্রান্তির জায়গাটাও সেখানেই। জনকল্যাণের জন্য যে সামাজিক সহযোগিতা প্রয়োজন, যে জায়গায় রাষ্ট্রের দৃশ্যমান হাত দরকার, নিও সেখানে বাজারের অদৃশ্য হাতেই আস্থা রাখে।

মানুষ কি সত্যিই এতটা যুক্তিবাদী?

সবচেয়ে বড় সমস্যা অবশ্য মনস্তাত্ত্বিক। নিওর বিকাশ যেন সেখানেই থেমে গেছে।

বিবর্তনীয় জীববিদ্যা, মনোবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব এবং আচরণগত অর্থনীতির বিপুল গবেষণা মানুষের আচরণের যে জটিল ছবি তুলে ধরে, নিও তার প্রায় কিছুই জানে না। মানুষকে কেবল হিসেবি, স্বার্থসন্ধানী এবং যুক্তিবাদী সত্তা হিসেবে দেখলে তার সহমর্মিতা, সহযোগিতা, সামাজিক বন্ধন কিংবা আত্মত্যাগের জায়গাগুলি কোথায় থাকবে?

হালদারের যুক্তি তাই তীব্র। মানবজাতিকে বাঁচাতে হলে নিওকে পেরিয়ে যেতে হবে। বাজারের ঊর্ধ্বগতির যে ‘বুল রান’-এর স্বপ্ন সে দেখে, তা শেষ পর্যন্ত মানুষের হয়ে ওঠার অর্থের উপরেই ষাঁড়ের তাণ্ডব হয়ে আছড়ে পড়তে পারে।

ভাবনারা যখন চরিত্র

বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবনাকে চরিত্রে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে এভরিম্যান নিঃসন্দেহে উদ্ভাবনী। বইটির প্রসঙ্গ ও সূত্রের ব্যাপ্তিও বিস্ময়কর। সাহিত্যিক নৈপুণ্যের দুঃসাহসী প্রদর্শন রয়েছে লেখায়—উপমা, শ্লেষ, ইঙ্গিত দ্রুত একটির উপর আরেকটি এসে জমা হয়। নিও এবং তার কথোপকথনের সঙ্গীদের বর্ণনায় শেক্সপিয়র থেকে বোর্হেস পর্যন্ত নানা সাহিত্যিক অনুষঙ্গ হাজির হয়।

বইটির সেরা অংশ শেষের এক-তৃতীয়াংশ। সেখানে অর্থনীতির বিরুদ্ধে অভিযোগের চেয়ে বেশি করে ফুটে ওঠে, কীভাবে আমাদের পৃথিবী আসলে নানা শক্তির এক দুর্বোধ্য জোড়াতালি। হালদারের ভাষায়, তথ্যের এই অতিপ্রাচুর্যের যুগে ‘সংরক্ষণাগারটিকে রত্নভাণ্ডারের বদলে অর্থের কবরস্থান বলেই মনে হচ্ছিল।’

তবে এখানেই বইটির সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট।

যেখানে অভিযোগ দুর্বল

হালদারের রূপককাহিনি সর্বত্র সমান সফল নয়। কিছু সাহিত্যিক ইঙ্গিত ও রসিকতা নিখুঁত ভাবে লক্ষ্যভেদ করে, অনেকগুলি আবার করে না। বইটির বাগ্মিতার শক্তি অনেক সময় তার বিশ্লেষণী সূক্ষ্মতাকে ছাপিয়ে যায়। একের পর এক ভাবনার ঝড় ওঠে, কিন্তু সেগুলির আলোচনা অনেক সময় যেন তাদের ‘টুইটার সংস্করণ’-এর মধ্যেই আটকে থাকে।

শুরুর ভাবনার ইতিহাসে নিওকে যখন অ্যাডাম স্মিথ, কেইনস এবং হায়েকের উত্তরসূরি হিসেবে হাজির করা হয়, তখন এই চিন্তাবিদদের উপস্থাপনা প্রায় ব্যঙ্গচিত্রের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আঘাতটা সেখানেই কিছুটা লক্ষ্যভ্রষ্ট।

এভরিম্যান-এ এমন প্রায় কিছুই নেই, যা এই চিন্তাবিদদের অজানা ছিল। এমনকি হায়েক, যাঁকে এখানে অনেকটা অজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে, বাজারের তত্ত্বের পাশাপাশি কমন ল, প্রথা এবং বিচারিক নজির থেকে গড়ে ওঠা আইনেরও গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ছিলেন।

আর সমস্ত অনিষ্টের মূলে কেবল ‘নিও’—এই ধারণাটিও কিছুটা বেশি সরলীকৃত।

সহযোগিতা ও আত্মত্যাগের প্রতি মানুষের প্রবণতা যখন জাতীয়তাবাদের রূপ নেয়, তখন সেটিই আবার ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। নিওর যুক্তিবাদিতার মতোই সেই পরিচয়বোধও সহযোগিতার পথ আটকে দিতে পারে।

তাই নিও বনাম এভরিম্যানের সংঘাত আসলে দুই ধরনের মানুষের সংঘাত নয়। বরং তা আমাদের প্রত্যেকের ভিতরে চলতে থাকা এক গৃহযুদ্ধ।

আর এখানেই শেষ প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে ওঠে—নিও যদি এতটাই সীমাবদ্ধ, এতটাই অসম্পূর্ণ হয়, তা হলে শেষ পর্যন্ত সে জিতল কেন?

হালদারের বইয়ের বাগ্মিতার আতিশয্য পেরিয়ে তখন শেক্সপিয়রের ভাষাতেই প্রশ্নটা ফিরে আসে—প্রতিবাদ কি তবে একটু বেশিই উচ্চকিত হয়ে উঠছে না?

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles