হাইলাইটস:

  • ইরান-ইজরায়েল উত্তেজনার মধ্যেই নতুন কূটনৈতিক নাটকীয়তার দাবি।
  • মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, ইরানের কোনও শীর্ষ নেতাকে ইজরায়েল হত্যা করলে ভেস্তে যেতে পারে শান্তি-আলোচনার সম্ভাবনা।
  • সেই কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক অংশীদার দেশের মাধ্যমে তেহরানকে সতর্কবার্তা পাঠানোর উদ্যোগ নেয় ওয়াশিংটন।
  • দাবি করা হয়েছে, ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফকে বহনকারী বিমান সম্ভাব্য হামলার সতর্কতা পাওয়ার পর জরুরি অবতরণ করে।
  • ঘটনাগুলি দেখিয়ে দিচ্ছে, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি গোপন কূটনীতি ও গোয়েন্দা তৎপরতাও সমান তীব্র হয়ে উঠেছে।

বাংলাস্ফিয়ার: ইরান ও ইজরায়েলের সংঘাত যখন সরাসরি সামরিক মোকাবিলার পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন পর্দার আড়ালে আরও এক জটিল কূটনৈতিক লড়াই চলছিল। মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, যদি ইজরায়েল ইরানের কোনও শীর্ষ রাজনৈতিক বা সামরিক নেতাকে হত্যা করে, তবে বহু কষ্টে গড়ে ওঠা সম্ভাব্য শান্তি-আলোচনা মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়তে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক বন্ধু ও অংশীদার দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে তেহরানকে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়।

মার্কিন প্রশাসনের মূল্যায়ন ছিল, ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সফল হত্যাচেষ্টা শুধু যুদ্ধকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে না, বরং কূটনৈতিক পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে। ইরান তখন প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে এবং পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছবে, যেখান থেকে আর আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে। সেই কারণেই আমেরিকা সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি আলোচনার সম্ভাবনাও বাঁচিয়ে রাখতে চাইছিল।

ওয়াশিংটনের এই প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আঞ্চলিক কূটনীতি। মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশের সঙ্গে একইসঙ্গে আমেরিকা ও ইরানের যোগাযোগ রয়েছে, তাদের মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর চেষ্টা হয়। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—ইরানের নেতৃত্ব যেন বুঝতে পারে, সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি রয়েছে এবং তারা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়। একই সঙ্গে এই বার্তাও দেওয়া হয় যে, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।

এই উত্তেজনার মধ্যেই সামনে আসে আরও একটি নাটকীয় ঘটনা। খবর অনুযায়ী, ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফকে বহনকারী বিমান উড়ন্ত অবস্থায় সম্ভাব্য হামলার সতর্কতা পায়। নিরাপত্তা সংক্রান্ত সেই সতর্কবার্তার পর বিমানটিকে জরুরি ভিত্তিতে অবতরণ করানো হয়। যদিও এই ঘটনার সমস্ত বিবরণ প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও এটি স্পষ্ট যে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অত্যন্ত বেড়েছে।

গালিবাফ ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি অতীতে সামরিক বাহিনীর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রভাবশালী মুখ। ফলে তাঁকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার খবর শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং গোটা ইরানি রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্যই উদ্বেগের বিষয়।

মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, এই ধরনের কোনও হত্যাকাণ্ড ঘটলে ইরানের অভ্যন্তরে কঠোর অবস্থানের সমর্থকরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবেন। তখন আলোচনার পক্ষে থাকা নেতাদের অবস্থান দুর্বল হবে। ফলে ভবিষ্যতে পরমাণু কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা—কোনও বিষয়েই আলোচনার পরিবেশ থাকবে না।

অন্যদিকে ইজরায়েলের নিরাপত্তা নীতিতে বহুদিন ধরেই লক্ষ্যভিত্তিক হামলা একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অতীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী, সামরিক কর্মকর্তা এবং বিদেশে অবস্থানকারী বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে অভিযানের অভিযোগ উঠেছে। যদিও প্রতিটি ঘটনার দায় ইজরায়েল প্রকাশ্যে স্বীকার করে না, তবুও এই ধরনের অভিযান তাদের প্রতিরক্ষা নীতির অংশ বলে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।

এই বাস্তবতায় আমেরিকা একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। একদিকে তারা ইজরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে, অন্যদিকে এমন কোনও পদক্ষেপ যাতে বৃহত্তর যুদ্ধের কারণ না হয়ে ওঠে, সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাই নয়, বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বড় ধাক্কা খেতে পারে।

কূটনৈতিক সূত্রের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে গোপন বার্তা আদানপ্রদান বেড়েছে। সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব না হলেও বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তা পৌঁছনোর চেষ্টা চলছে। এই প্রক্রিয়ায় উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভুল হিসাব বা ভুল সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বড় বিপদ। যদি কোনও হামলা এমন সময়ে ঘটে, যখন উভয় পক্ষ আলোচনার সম্ভাবনা যাচাই করছে, তাহলে তা শুধু সামরিক প্রতিক্রিয়াই ডেকে আনবে না, রাজনৈতিক বিশ্বাসও সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেবে। সেই কারণেই সম্ভাব্য হত্যাচক্রান্ত রুখতে এবং ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে নেপথ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

গালিবাফের বিমানকে ঘিরে জরুরি অবতরণের ঘটনাও দেখিয়ে দিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্য এখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আধুনিক যুদ্ধে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধবিমান নয়, তথ্য, নজরদারি এবং আগাম সতর্কবার্তাই অনেক সময় বড় সংঘাত এড়ানোর প্রধান অস্ত্র হয়ে ওঠে।

পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত অনিশ্চিত। একদিকে সামরিক প্রস্তুতি অব্যাহত, অন্যদিকে আলোচনার সম্ভাবনাও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। এই দুই বিপরীত বাস্তবতার মাঝখানেই চলছে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কূটনৈতিক লড়াই। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে সংঘাত সীমাবদ্ধ রাখতে, ইজরায়েল নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আর ইরান নিজের নেতৃত্ব ও কৌশলগত সক্ষমতা রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

আগামী কয়েক সপ্তাহই নির্ধারণ করতে পারে, মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে এগোবে, নাকি গোপন কূটনীতির পথ শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা প্রশমনে কার্যকর হবে। আপাতত নিশ্চিত করে বলা যায়, যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে যে নীরব কূটনৈতিক লড়াই চলছে, তার গুরুত্ব কোনও অংশে সামরিক সংঘর্ষের চেয়ে কম নয়।