হাইলাইটস:

  • তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার ক্ষেত্রে পুলিশের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল কলকাতা হাই কোর্ট।
  • আদালতের পর্যবেক্ষণ, অভিযোগপত্রে নির্দিষ্ট অভিযোগ, নাম বা তারিখের উল্লেখ নেই; অভিযোগটি অনেকটাই ‘সর্বগ্রাসী’।
  • বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেন, এফআইআর হওয়ার এক দিনের মধ্যে কী উপাদানের ভিত্তিতে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হল, তা নিয়ে আদালতের উদ্বেগ রয়েছে।
  • আপাতত অ্যাকাউন্ট চালুর অনুমতি দেয়নি আদালত।
  • তদন্তকারী সংস্থাকে তদন্তে সংগৃহীত সমস্ত নথি এবং ফ্রিজ করা অ্যাকাউন্টগুলির মোট অর্থের বিবরণ ৮ জুলাইয়ের মধ্যে জমা দিতে নির্দেশ।
  • আদালতে তৃণমূলের দাবি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক কাজকর্ম কার্যত অচল করে দেওয়া হয়েছে।
  • রাজ্যের দাবি, তদন্তে এমন তথ্য মিলেছে যা আদালতকে বিস্মিত করবে।

বাংলাস্ফিয়ার: তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার ঘটনায় বুধবার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল কলকাতা হাই কোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল, অভিযোগপত্রে নির্দিষ্ট তথ্যের অভাব রয়েছে এবং এফআইআর দায়ের হওয়ার পর এত দ্রুত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার পিছনে তদন্তকারী সংস্থার কাছে কী উপাদান ছিল, তা নিয়ে আদালতের যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। তবে একই সঙ্গে আদালত এই পর্যায়ে কোনও অন্তর্বর্তী স্বস্তি দিতে রাজি হয়নি।

বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের এজলাসে শুনানির সময় আদালত মন্তব্য করে, “এত তড়িঘড়ি এই পদক্ষেপ কেন নেওয়া হল এবং তদন্তকারী সংস্থার হাতে কী তথ্য ছিল, সেটাই আমাদের ভাবাচ্ছে।”

তৃণমূলের পক্ষ থেকে প্রবীণ আইনজীবী কিশোর দত্ত এবং অভিষেক মনু সিংভি যুক্তি দেন, সম্পূর্ণ অস্পষ্ট ও সাধারণ ধরনের অভিযোগের ভিত্তিতেই দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলি ফ্রিজ করা হয়েছে। প্রথমে তিনটি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হলেও পরে আরও পাঁচটি অ্যাকাউন্টের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর ফলে দলের সমস্ত আর্থিক লেনদেন কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

তাদের দাবি, এফআইআর-এ কেবল ‘যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ’-এর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কোথাও নির্দিষ্ট অপরাধ, নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট লেনদেনের উল্লেখ নেই। সংগঠিত অপরাধ সংক্রান্ত আইনের ধারাও এখানে প্রয়োগ করা হয়েছে, যদিও সেই ধারার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয়নি বলে দাবি তৃণমূলের আইনজীবীদের।

তবে আদালত জানিয়ে দেয়, এই পর্যায়ে অভিযোগের সত্যতা বা মিথ্যাতা নিয়ে বিশদে বিচার করা হবে না। আদালতের বক্তব্য, অভিযোগ এখনও অস্পষ্ট অবস্থায় রয়েছে। তাই এখনই তার গভীরে গিয়ে বিচার করা সমীচীন হবে না।

আদালতের মতে, এই মুহূর্তে মূল প্রশ্ন হল তদন্ত চলাকালীন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ডেবিট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত আদৌ যুক্তিযুক্ত কি না।

শুনানিতে তৃণমূলের আইনজীবীরা আরও যুক্তি দেন, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১০৬ নম্বর ধারা পুলিশকে সন্দেহজনক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দিলেও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার ক্ষমতা দেয় না। তাঁদের বক্তব্য, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

এর উত্তরে আদালত প্রশ্ন তোলে, যদি অভিযোগই হয় যে অপরাধলব্ধ অর্থ ওই অ্যাকাউন্টে জমা রয়েছে, তাহলে তদন্তকারী সংস্থা কীভাবে তদন্ত এগোবে? আদালত মন্তব্য করে, “অভিযোগ যদি এই অ্যাকাউন্টগুলিকে ঘিরেই হয়, আর আদালত যদি সেগুলি খুলে দেয়, তাহলে তদন্ত কি কার্যত বাধাগ্রস্ত হবে না?”

শুনানির সময় আদালত একটি সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার কথাও তোলে। বিচারপতি বলেন, প্রয়োজনে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের বিশেষ আধিকারিক হিসেবে নিয়োগ করে তাঁদের তত্ত্বাবধানে সীমিত আর্থিক লেনদেনের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। যদিও এ বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়নি।

রাজ্য পুলিশের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা অন্তর্বর্তী কোনও নির্দেশের বিরোধিতা করেন। তিনি আদালতের কাছে সময় চেয়ে বলেন, তদন্তে এমন তথ্য ও নথি সংগ্রহ করা হয়েছে যা আদালতের বিবেককে নাড়া দিতে পারে। তাঁর বক্তব্য, তদন্ত এখনও চলছে এবং সংগৃহীত তথ্য আদালতের সামনে পেশ করার সুযোগ দেওয়া উচিত।

অন্যদিকে অভিষেক মনু সিংভি যুক্তি দেন, একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের সমস্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া মানে কার্যত দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড অচল করে দেওয়া। তিনি বলেন, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার সংবিধানের ১৪ এবং ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের সুরক্ষার অন্তর্ভুক্ত। তাই প্রশাসনের মাধ্যমে কোনও রাজনৈতিক দলকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া গণতান্ত্রিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

তবে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এই মুহূর্তে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে তারা প্রবেশ করতে চায় না। আদালতের মূল লক্ষ্য হল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার সিদ্ধান্তের পেছনে তদন্তকারী সংস্থার হাতে কী তথ্য ছিল, তা খতিয়ে দেখা।

মামলার অভিযোগকারী পক্ষের আইনজীবী নীরজ কিশন কৌল দাবি করেন, তৃণমূলের নেতৃত্ব নিয়ে একাধিক গোষ্ঠীর দাবি রয়েছে। ফলে এই মামলা গ্রহণযোগ্য কি না, সেই প্রশ্নও বিবেচনার দাবি রাখে। তাঁর বক্তব্য, শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ প্রকৃত নেতৃত্বে রয়েছে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন।

কিন্তু এই যুক্তিতেও সন্তুষ্ট হয়নি আদালত। বিচারপতি বলেন, অভিযোগপত্রে কোথাও দলের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের কথা উল্লেখ নেই। আদালতের পর্যবেক্ষণ, “আপনাদের অভিযোগ আমাদের মনে আস্থা জাগাতে পারছে না। এখানে নির্দিষ্ট অভিযোগ নেই, কোনও তারিখ নেই, কোনও নামও নেই। ফৌজদারি মামলার ভিত্তিটা খুব শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছে না।”

আদালত আরও জানিয়ে দেয়, অভিযোগপত্রে যা লেখা রয়েছে, তার বাইরে গিয়ে নতুন নতুন বিষয় এই পর্যায়ে আলোচনার সুযোগ নেই।

সব দিক বিবেচনা করে আদালত আপাতত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট চালুর অনুমতি দেয়নি। তবে তদন্তকারী সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছে, ফ্রিজ করা সমস্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কত টাকা রয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং তদন্তে সংগৃহীত সমস্ত প্রাসঙ্গিক নথি আদালতে জমা দিতে হবে।

মামলার পরবর্তী শুনানি হবে ৮ জুলাই। সেদিন তদন্তকারী সংস্থার জমা দেওয়া নথি খতিয়ে দেখে আদালত সিদ্ধান্ত নেবে, তৃণমূলের অন্তর্বর্তী স্বস্তির আবেদন মঞ্জুর করা হবে কি না। আদালতের এই পর্যবেক্ষণ নিঃসন্দেহে মামলার পরবর্তী শুনানিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলল।