- অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির অস্পষ্ট ভাষা এখন আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে নতুন বিরোধের কারণ।
- হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে দুই পক্ষের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
- ইরান বিকল্প সমুদ্রপথ ব্যবহার ঠেকাতে গিয়ে একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালায়।
- পাল্টা জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও উপকূলীয় রাডার ঘাঁটিতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্পষ্ট চুক্তির সুযোগ নিয়ে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।
বাংলাস্ফিয়ার: মাত্র দুই সপ্তাহ আগে স্বাক্ষরিত আমেরিকা-ইরানের অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভাষাগত অস্পষ্টতা এখন দুই দেশের সম্পর্কের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। গত ৭২ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যে সংঘাতের বিস্তার ঘটেছে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে—চুক্তির একাধিক ধারা দুই দেশ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে।
সংঘাতের সূচনা হয় বৃহস্পতিবার, যখন ইরানের বাহিনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালায়। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়।
অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছিল, ইরান ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে “সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” নেবে। কিন্তু “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” কিংবা “সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা” বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা কোথাও স্পষ্ট করা হয়নি।
এই অস্পষ্টতার সুযোগেই ইরান দাবি করছে, কোন পথ দিয়ে জাহাজ চলবে, তা নির্ধারণ করার অধিকার তাদের রয়েছে। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে তেহরান ঘোষণা করে, জাহাজগুলোকে শুধুমাত্র ইরানের জলসীমা ঘেঁষা পথ ব্যবহার করতে হবে। ওমান উপকূলের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বিকল্প নৌপথ ব্যবহার না করারও নির্দেশ দেয় তারা।
প্যারিসের সায়েন্সেস পো-র আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রায়েভস্কির মতে, সমঝোতাটি কার্যকর করতে ইচ্ছাকৃতভাবেই ভাষা নমনীয় রাখা হয়েছিল। কিন্তু দুই পক্ষ একই শব্দের ভিন্ন অর্থ করলে সেই নমনীয়তা দ্রুত ভেঙে পড়ে।
তার মতে, চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার আগেই উভয় দেশ বাস্তবে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, যাতে ভবিষ্যৎ আলোচনায় সুবিধা নেওয়া যায়।
ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রিউর মূল্যায়ন, ইরান মূলত পরীক্ষা করে দেখছে, হরমুজ প্রণালির ওপর তারা কতটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। যদি সীমিত সামরিক পদক্ষেপেই জাহাজগুলোকে ইরানের নিয়ন্ত্রিত পথে যেতে বাধ্য করা যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া না দেখায়, তাহলে তেহরানের জন্য সেটি লাভজনক হতে পারে।
শুক্রবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানে। এর কয়েক ঘণ্টা পর বাহরাইন জানায়, দেশটি ইরানি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে।
এই পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন দুই দেশ আলোচনার টেবিলে বসে যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো আরও স্পষ্ট করার কথা ছিল। ফলে সদ্য প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স সম্প্রতি দাবি করেছিলেন, উত্তেজনা কমাতে আমেরিকা ও ইরানের সেনাবাহিনীর মধ্যে একটি সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা বা “হটলাইন” চালু হয়েছে। কিন্তু ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি সেই দাবি অস্বীকার করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে এমন কোনও যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা এবং সাবেক সামরিক কমান্ডার মোহসেন রেজায়ি আমেরিকার বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সমঝোতার কোনও ধারা ভঙ্গ হলে তার “দ্রুত ও কঠোর” জবাব দেওয়া হবে।
ইরানের বেসামরিক ও সামরিক উভয় মহলের কর্মকর্তারাই দাবি করছেন, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল তেহরানই নিয়ন্ত্রণ করবে। কেউ কেউ বলেছেন, এ কাজে ওমান সহযোগিতা করতে পারে। পাশাপাশি ইরান জানিয়েছে, প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে তারা অর্থ আদায় করতে পারে, যদিও সেটিকে তারা “টোল” নয়, বরং বিভিন্ন পরিষেবার বিনিময়ে নেওয়া ফি বলে দাবি করছে।
এই অবস্থান সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে আমেরিকা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, কোনও দেশেরই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য জাহাজের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অধিকার নেই। তবে অন্তর্বর্তী চুক্তিতে মাত্র ৬০ দিনের জন্য অবাধ চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতের ব্যাখ্যা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াশিংটন হরমুজে অবাধ চলাচলকে আন্তর্জাতিক আইনের স্থায়ী নীতি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে তেহরান মনে করে, ৬০ দিনের এই অব্যাহতি ছিল কেবল চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য একটি সাময়িক রাজনৈতিক সমঝোতা। এই মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যই এখন যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে।