হাইলাইটস:

  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ভুয়ো ভিডিও, কণ্ঠস্বর ও পরিচয় ব্যবহারের বিরুদ্ধে আদালতে একের পর এক মামলা করছেন ভারতীয় তারকারা।
  • ঐশ্বর্য রাই বচ্চন তাঁর নাম, ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে ডিপফেক, অশ্লীল চ্যাটবট এবং অনুমতিহীন পণ্য বিক্রির বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে মামলা করেছেন।
  • আদালত অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বন্ধ এবং বেআইনি সামগ্রী সরানোর নির্দেশ দিয়েছে।
  • অমিতাভ বচ্চনের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, অনিল কাপুরের বিখ্যাত শব্দ ‘ঝকাস’, সুনীল গাভাস্কার ও গৌতম গম্ভীরের পরিচয়ও আইনি সুরক্ষা পেয়েছে।
  • ফেব্রুয়ারিতে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে সংশোধনের ফলে অভিযোগ পাওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যে আপত্তিকর বিষয়বস্তু সরানোর বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।
  • তবে এই আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ডিজিটাল অধিকারকর্মীরা।

বাংলাস্ফিয়ার: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্ফোরক অগ্রগতির ফলে পরিচয় চুরির ঝুঁকি এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। বলিউড তারকা এবং ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটারদের নাম, ছবি, কণ্ঠস্বর ও ব্যক্তিত্বকে ব্যবহার করে ভুয়ো ভিডিও, নকল প্রচার, অনুমতিহীন পণ্য বিক্রি এবং এমনকি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ চ্যাটবট তৈরি হওয়ায় তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে অভিনেত্রী ও প্রাক্তন বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বর্য রাই বচ্চন দিল্লি হাইকোর্টে মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, অনুমতি ছাড়াই তাঁর নাম ও ছবি ব্যবহার করে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে, ডিপফেক ভিডিও বানানো হচ্ছে এবং তাঁর পরিচয় ব্যবহার করে অশ্লীল কথোপকথন চালাতে সক্ষম একটি চ্যাটবটও তৈরি করা হয়েছে।

দিল্লি হাইকোর্ট প্রাথমিক পর্যায়েই সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটগুলিকে বন্ধ করার এবং বেআইনি পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধের অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয়। আদালত জানায়, এই ধরনের কাজ শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকেও লঙ্ঘন করে।

ঐশ্বর্যের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইন সংস্থা আনন্দ অ্যান্ড আনন্দ-এর ব্যবস্থাপনা অংশীদার প্রবীণ আনন্দ জানান, তাঁরা এসব মামলাকে কেবল স্বত্বলঙ্ঘন হিসেবে নয়, বরং পরিচয় চুরি হিসেবে তুলে ধরছেন। তাঁর মতে, কপিরাইট আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে কেউ সামান্য পরিবর্তন এনে শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু কোনও ব্যক্তির পরিচয় নকল করে বাণিজ্যিক লাভের চেষ্টা করা অনেক বিস্তৃত আইনি অপরাধ।

২০২২ সাল থেকে দিল্লি হাইকোর্টে ব্যক্তিত্ব বা পরিচয়-অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ভারতীয় তারকারা ২০টিরও বেশি মামলা করেছেন।

ঐশ্বর্যের শ্বশুর অমিতাভ বচ্চন তাঁর স্বতন্ত্র গম্ভীর কণ্ঠস্বরের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আদালতের সুরক্ষা পেয়েছেন। একইভাবে প্রাক্তন ক্রিকেটার সুনীল গাভাস্কার ও গৌতম গম্ভীরও তাঁদের পরিচয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা আদায় করেছেন।

অভিনেতা অনিল কাপুর তাঁর স্বাক্ষরধর্মী উচ্চারণে ব্যবহৃত জনপ্রিয় শব্দ ‘ঝকাস’-এর বাণিজ্যিক অপব্যবহারের বিরুদ্ধেও আইনি সুরক্ষা পেয়েছেন।

তবে কোন বিষয়টি আইনি সুরক্ষার আওতায় পড়বে, তা সবসময় স্পষ্ট নয়। আইন সংস্থা সিরিল অমরচাঁদ মঙ্গলদাস-এর অংশীদার স্বাতী শর্মা বলেন, কেউ যদি সাধারণভাবে ‘ঝকাস’ শব্দটি ব্যবহার করেন, তা অপরাধ নয়। কিন্তু অনিল কাপুরের স্বতন্ত্র ভঙ্গি, চেহারা বা অভিনয়শৈলী নকল করে বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে শব্দটি ব্যবহার করলে সেটি ব্যক্তিত্ব-অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আদালত এখন গতিশীল নিষেধাজ্ঞা জারিও করছে। অর্থাৎ, নিষিদ্ধ কোনও ওয়েবসাইট বন্ধ হওয়ার পর একই ধরনের নতুন ওয়েবসাইট চালু হলে, নতুন করে পূর্ণাঙ্গ মামলা না করেই আদালতের নিবন্ধকের মাধ্যমে দ্রুত তা বন্ধ করার আবেদন করা যায়।

এদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, কোনও সরকারি নোটিশ পাওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আপত্তিকর বিষয়বস্তু সরাতে হবে। আর সম্মতি ছাড়া তৈরি অন্তরঙ্গ ডিপফেক বা ব্যক্তিগত ছবি হলে দুই ঘণ্টার মধ্যেই তা অপসারণ করতে হবে।

আগে এই সময়সীমা ছিল ৩৬ ঘণ্টা। নতুন আইন শুধু তারকাদের নয়, সাধারণ নাগরিকদের পরিচয় রক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, এমনকি যেখানে সরাসরি বাণিজ্যিক লাভের প্রশ্ন নেই, সেখানেও।

তবে এত অল্প সময়ে অভিযোগ যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন বলে জানিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংস্থাগুলি। মেটা-র নীতিনির্ধারণ বিভাগের কর্মকর্তা রব শেরম্যান বলেন, প্রতিটি অভিযোগ যাচাই করে তিন ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া সবসময় বাস্তবসম্মত নয়।

অন্যদিকে ডিজিটাল অধিকার সংগঠন ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা অপর গুপ্ত মনে করেন, এই ধরনের ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাঁর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে তারকারা প্রথম শুনানিতেই একতরফাভাবে আদালতের নিষেধাজ্ঞা পেয়ে যান। অভিযুক্তরা প্রায়ই ছোট ওয়েবসাইট বা সাধারণ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী হওয়ায় তাঁদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করে দীর্ঘ আইনি লড়াই চালানো সম্ভব হয় না। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট বিষয়বস্তু মুছে ফেলা হয় এবং মামলার আর কোনও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না।

অন্যদিকে প্রবীণ আনন্দের দাবি, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ বা বৈধ মতপ্রকাশকে এই আইন দমিয়ে দেবে— এমন আশঙ্কা অতিরঞ্জিত। তাঁর মতে, আদালত প্রকৃত ব্যঙ্গ এবং পরিচয় চুরি— এই দুইয়ের পার্থক্য বুঝতে সক্ষম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো এআই বা ডিপফেক নিয়ন্ত্রণে ভারতের আলাদা কোনও পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। তবু আদালতের রায়, ব্যক্তিত্ব-অধিকার সংক্রান্ত বিচারিক নজির এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনের মাধ্যমে দেশটি ধীরে ধীরে ডিজিটাল পরিচয় সুরক্ষার একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।