হাইলাইটস:

  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর শিল্পকর্মের বিরুদ্ধে বাড়ছে শিল্পী ও সৃজনশীলদের প্রতিরোধ।
  • ‘অ্যান্টি-স্লপ’ নামে নতুন এক নান্দনিক ধারা জনপ্রিয় হচ্ছে, যেখানে গুরুত্ব পাচ্ছে হাতে তৈরি, অসম্পূর্ণ ও মানবিক শিল্প।
  • বহু শিল্পী অভিযোগ করছেন, এআই অন্যের সৃজনশীল শ্রম ব্যবহার করে লাভের ব্যবসা করছে।
  • ফটোগ্রাফার ও ডিজাইনার মাইকেল শ্মেলিংয়ের মতে, “এআই আমাদের গলায় জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
  • হাতে তৈরি স্টপ-মোশন অ্যানিমেশন ও খসখসে নকশা এখন এআই-এর মসৃণ ‘হাইপার-রিয়ালিজম’-এর বিরুদ্ধে প্রতীক হয়ে উঠছে।

বাংলাস্ফিয়ার: চলতি বছরের গোড়ার দিকে নিউ ইয়র্কে আয়োজিত হয়েছিল ‘রানওয়ে এআই সামিট’। চলচ্চিত্র নির্মাতা, বিজ্ঞাপন সংস্থার কর্তা এবং এআই শিল্পের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে দিনভর চলেছিল নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে উৎসবমুখর আলোচনা।

সেখানেই সানফ্রান্সিসকোর বিজ্ঞাপন সংস্থা সিলভারসাইডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা রব রুবেল গর্ব করে বলেছিলেন, কোকা-কোলার ২০২৫ সালের ‘হলিডে ক্যারাভান’ বিজ্ঞাপন তৈরিতে এআই ব্যবহার করে তাঁরা মাত্র দু’সপ্তাহে চিত্রনাট্য থেকে চূড়ান্ত নির্মাণে পৌঁছে গিয়েছিলেন।

কিন্তু তিনি একটি বিষয় উল্লেখ করেননি।

বিজ্ঞাপনটি প্রকাশের পর তা দর্শকদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে। কম্পিউটার-নির্মিত মেরুভালুক, অবাস্তব দেখতে ট্রাক এবং যান্ত্রিক দৃশ্যাবলীর জন্য বিজ্ঞাপনটিকে অনেকেই ‘কুৎসিত’, ‘প্রাণহীন’ এবং ‘চোখের যন্ত্রণা’ বলে আখ্যা দেন। এতটাই সমালোচনা হয় যে বিজ্ঞাপনটির চেয়ে সেটিকে ঘিরে বিতর্কই বড় খবর হয়ে ওঠে।

রুবেল নিজেও পরে স্বীকার করেন, “বিজ্ঞাপনটিকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, তা প্রায় বিজ্ঞাপনটির সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কারণ সেটি সৃজনশীল জগতের সামনে থাকা মৌলিক প্রশ্নগুলিকে সামনে নিয়ে আসে।”

‘স্লপ’-এর বিরুদ্ধে পাল্টা নন্দনচর্চা

গত কয়েক বছরে হাজার হাজার শিল্পী, লেখক, সংগীতশিল্পী ও ডিজাইনার এআই-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। কেউ অভিযোগ করেছেন তাঁদের কাজ অনুমতি ছাড়াই এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে। কেউ আবার কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করেছেন।

এখন সেই প্রতিরোধ যেন নতুন এক শিল্পরীতিতে রূপ নিচ্ছে।

অনেকেই একে বলছেন—‘অ্যান্টি-স্লপ’।

এআই-নির্মিত ছবির বৈশিষ্ট্য হলো তার অস্বাভাবিক মসৃণতা, নিখুঁততা এবং বাস্তবতার অনুকরণ। বিপরীতে ‘অ্যান্টি-স্লপ’ শিল্পে গুরুত্ব পাচ্ছে হাতের আঁচড়, অসম্পূর্ণতা, খসখসে রেখা, ভুলভ্রান্তি এবং ব্যক্তিগত স্পর্শ।

খাতার মার্জিনের আঁকিবুঁকি থেকে নতুন নন্দনচেতনা

এই প্রবণতার অন্যতম উদাহরণ ফটোগ্রাফার ও ডিজাইনার মাইকেল শ্মেলিংয়ের কাজ।

রোলিং স্টোনসের ফটোবই, গায়িকা শ্যারন ক্যাথারিন ভ্যান এটেন- এর অ্যালবাম কভার এবং সম্প্রতি চিলির প্রখ্যাত সাহিত্যিক রবার্ট বোলানো-র উপন্যাসগুলির নতুন সংস্করণের প্রচ্ছদ তিনি তৈরি করেছেন।

এই প্রচ্ছদগুলিতে দেখা যায় ইচ্ছাকৃতভাবে অমসৃণ, আঁকিবুঁকি-ধর্মী নকশা। যেন কোনও স্কুলপড়ুয়ার খাতার মার্জিনে আঁকা ছবি, কিংবা কোনও ভূগর্ভস্থ পাঙ্ক সঙ্গীত অনুষ্ঠানের পোস্টার। অনেক সমালোচক এগুলিকে ‘খারাপ’, ‘অতিরিক্ত শিশুসুলভ’ এমনকি ‘ওয়োক’(woke) বলেও আক্রমণ করেছেন।

কিন্তু শ্মেলিংয়ের মতে, এটাই আসল কথা। কারণ এআই কখনও এমন কাজ তৈরি করবে না।

তিনি বলেন, “এআই আমাদের গলায় জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।”

আরও স্পষ্ট ভাষায় তাঁর মন্তব্য, “সৃজনশীলতার দিক থেকে এআই অন্য মানুষের শ্রমের উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে। অথচ লাভ করছে অন্য কেউ। আমি এই ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিরোধী।”

সম্প্রতি একটি সংস্থা তাঁকে প্রস্তাব দিয়েছিল, তাঁর আঁকা ছবিগুলি ব্যবহার করে তাদের এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে। তিনি সেই প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।

হাতে তৈরি অ্যানিমেশনের প্রত্যাবর্তন

‘অ্যান্টি-স্লপ’-এর আরেকটি জনপ্রিয় উদাহরণ হল আমেরিকান ফুটবল দল গ্রিন বে প্যাকার্সের একটি প্রচারচিত্র।

এমি পুরস্কারপ্রাপ্ত অ্যানিমেশন স্টুডিও স্টুপিড বাডি স্টুডিয়োজ এটি তৈরি করে। ভিডিওটিতে খেলোয়াড়দের ১৯৮০-র দশকের অ্যাকশন ফিগারের মতো দেখানো হয়েছিল। তারা লড়াই করছে মানবসদৃশ চিজের টুকরোর সঙ্গে।

সবকিছুই তৈরি হয়েছিল পুরোনো দিনের স্টপ-মোশন প্রযুক্তিতে—একটি একটি ফ্রেম হাতে সাজিয়ে।

স্টুডিওর সহ-প্রতিষ্ঠাতা John Harvatine IV বলেন, “আমরা এখানে সবকিছু হাতে তৈরি করি। দর্শকদের প্রতিক্রিয়া আমাদের উৎসাহিত করেছে।”

ভিডিওটির ‘বিহাইন্ড দ্য সিনস’ ক্লিপ প্রকাশ করে গ্রিন বে-র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দল লিখেছিল, “তোমাদের এআই স্লপ আমাদের বিরক্ত করে।”

এটি ছিল এআই-নির্ভর কনটেন্টের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য খোঁচা।

তবে হারভাটিনে নিজে এআই-বিরোধী মৌলবাদে বিশ্বাসী নন। তাঁর স্টুডিওও কিছু ডিজিটাল এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করে।

কিন্তু তাঁর প্রশ্ন, “যখন একটি গল্প বলার কথা আসে, তখন কেন শুধু নির্দেশ লিখে কোনও যন্ত্রকে সেই গল্প বানিয়ে দিতে দেব? আমরা নিজেদের সৃজনশীলতা পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢেলে দিতে চাই।”

ফটোগ্রাফির আগমন যেমন বদলে দিয়েছিল শিল্পকে

অনেক শিল্প-সমালোচকের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি উনিশ শতকের শেষভাগের কথা মনে করিয়ে দেয়।

তখন সাধারণ মানুষের হাতে ক্যামেরা পৌঁছে যাওয়ায় বাস্তব দৃশ্য হুবহু আঁকার প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। ফলে শিল্পীরা নতুন পথ খুঁজতে শুরু করেন।

সেখান থেকেই জন্ম নেয় ইমপ্রেশনিজম, কিউবিজম, সুররিয়ালিজমসহ অসংখ্য নতুন শিল্পধারা।

আজ এআই যখন নিখুঁত বাস্তবতার ছবি তৈরি করতে পারছে, তখন শিল্পীরাও হয়তো নতুন এক সৃজনশীল ভাষা খুঁজে নিচ্ছেন যেখানে মানবিকতা, ব্যক্তিত্ব এবং অপূর্ণতাই হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ।

তবু সংশয় রয়ে গেছে

তবে শ্মেলিং খুব বেশি আশাবাদী নন। তাঁর ধারণা, এই ‘অ্যান্টি-স্লপ’ আন্দোলনের বিরুদ্ধেও শিগগিরই পাল্টা প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। প্রযুক্তিপ্রেমী শিল্পী ও সাধারণ মানুষের একাংশ আবারও এআই-এর পক্ষে দাঁড়াবেন।

তিনি উদাহরণ দেন ফটোশপের।

একসময় ডিজিটাল সম্পাদনার বিরুদ্ধে অনেক শিল্পী প্রতিবাদ করেছিলেন। নিজেদের কাজে ‘ফটোশপ ব্যবহার করা হয়নি’—এ কথা গর্ব করে ঘোষণা করতেন।

আজ সেই বিতর্ক প্রায় বিস্মৃত। কারণ এখন স্মার্টফোনে তোলা প্রায় প্রতিটি ছবিই কোনও না কোনওভাবে এডিটেড।

শ্মেলিংয়ের কথায়, “সেই পুরনো বিতর্কগুলো এখন প্রায় হাস্যকর মনে হয়। আজ আমাদের আইফোন থেকে বেরোনো প্রতিটি ছবিই কোনও না কোনওভাবে সংশোধিত।”

তবু আপাতত শিল্পজগতের একাংশ যেন ঘোষণা করে দিয়েছে—নিখুঁততার চেয়ে মানবিক অপূর্ণতা অনেক বেশি মূল্যবান। এআই-এর চকচকে, মসৃণ জগতের বিরুদ্ধে তাই শুরু হয়েছে খসখসে রেখা, হাতের আঁচড় এবং মানুষের ভুলভ্রান্তিকে হাতিয়ার করে এক নতুন বিদ্রোহ।