হাইলাইটস:
- ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কের টানাপোড়েনে ইজরায়েলে বাড়ছে অস্বস্তি।
- নিউ ইয়র্কে ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থীদের জয়কে ভবিষ্যতের বড় রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
- আমেরিকায় ইজরায়েল-বিরোধী মনোভাব দ্রুত বাড়ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
- সামরিক সাহায্য, জাতিসংঘে কূটনৈতিক সমর্থন ও কর-ছাড়—সবই ভবিষ্যতে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
- আসন্ন ইজরায়েলি নির্বাচনে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে।
বাংলাস্ফিয়ার: কয়েক সপ্তাহ ধরেই ইজরায়েলের সংবাদমাধ্যমে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—ওয়াশিংটনের সঙ্গে বহু দশকের অটুট সম্পর্ক কি এবার সত্যিই দুর্বল হয়ে পড়ছে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তির উদ্যোগ, যা বহু ইজরায়েলির চোখে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল, এবং প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে প্রকাশ্যে একাধিকবার তিরস্কার—এই দুই ঘটনাই ইজরায়েলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এতদিন যাঁকে হোয়াইট হাউসে ইজরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসেবে দেখা হত, তাঁকেই এখন নতুন দৃষ্টিতে বিচার করা হচ্ছে।
এই উদ্বেগ আরও বেড়ে যায় নিউ ইয়র্ক সিটির সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর। মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থিত তিন জন ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থী ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস প্রাথমিক নির্বাচনে জয়ী হন। তাঁরা প্রত্যেকেই ইজরায়েলের কড়া সমালোচক এবং নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গাজা যুদ্ধ ও ফিলিস্তিন প্রশ্নকে তুলে ধরেছেন।
ইজরায়েলে এখনও কেউ বলছেন না যে দেশটির উচিত আমেরিকার বদলে চীন বা রাশিয়ার দিকে ঝোঁকা। কিন্তু যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন-ইজরায়েল সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেছেন বা এই সম্পর্ক পরিচালনা করেছেন, তাঁদের অনেকেই সতর্ক করে দিচ্ছেন—পরিস্থিতি দ্রুত উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
তেল আবিবের উপ-মেয়র এবং ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিউ ইয়র্কে ইজরায়েলের কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আসাফ জামির বলেন, তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। তাঁর মতে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইহুদি অধ্যুষিত শহর নিউ ইয়র্কেই এখন প্রকাশ্যে ইজরায়েলকে ‘গণহত্যাকারী’ বা ‘বর্ণবিদ্বেষী রাষ্ট্র’ বলা হচ্ছে, এবং সেই ভাষ্য নির্বাচনে সমর্থনও পাচ্ছে।
অনেক বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের অকুণ্ঠ সমর্থনের উপর আর আগের মতো নির্ভর করতে পারবে না ইজরায়েল। শুধু বছরে কয়েকশো কোটি ডলারের সামরিক সাহায্য নয়, জাতিসংঘে ইজরায়েল-বিরোধী প্রস্তাবে মার্কিন ভেটো, এমনকি ইজরায়েলপন্থী দাতব্য সংস্থাগুলির কর-ছাড়ও একদিন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অধ্যাপক ড্যানিয়েল কার্টজারের কথায়, “আমরা যেন একটি খাদের দিকে এগিয়ে চলেছি।”
নিউ ইয়র্কের নির্বাচনে অবশ্য ইজরায়েলপন্থী কয়েকজন মধ্যপন্থী প্রার্থীও জয়ী হয়েছেন। কিন্তু ব্র্যাড ল্যান্ডার, ক্লেয়ার ভ্যালডেজ এবং দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়েরের জয়কে অনেকেই একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতার প্রতীক হিসেবে দেখছেন। ভ্যালডেজ গাজায় ইজরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তুলেছেন। শেভালিয়ের ইজরায়েলের অস্তিত্বের নৈতিক ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন এবং দেশটিকে বর্ণবিদ্বেষী রাষ্ট্র বলেছেন।
আসাফ জামির নিজেকে বামপন্থী, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থক এবং শান্তির পক্ষের মানুষ বলেই পরিচয় দেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্য, “আমি অন্ধ নই। আমি জানি ইজরায়েলের বাস্তবতা কী। আমরা সেই অপরাধের সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে দেখতে পারি না, অথচ আমেরিকায় ক্রমশ বেশি মানুষ এই অভিযোগ বিশ্বাস করছেন এবং সেই ভিত্তিতেই ভোট দিচ্ছেন।”
আসলে গাজায় গত দুই বছরের যুদ্ধের পর থেকেই আমেরিকায় ইজরায়েলের জনপ্রিয়তা দ্রুত কমতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত ও প্রায় ২৫০ জনকে অপহরণের পর ইজরায়েলের সামরিক অভিযানে গাজায় কয়েক হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। খাদ্যাভাব, দুর্ভিক্ষ এবং ব্যাপক ধ্বংসের চিত্র বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে জনমত সমীক্ষাতেও। গত বছর এক সমীক্ষায় প্রথমবার আমেরিকানদের সহানুভূতি ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইজরায়েলের তুলনায় বেশি দেখা যায়। আর চলতি বছরের আরেকটি সমীক্ষায় ৬০ শতাংশ আমেরিকান ইজরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মত প্রকাশ করেছেন, যা কয়েক বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
নিউ ইয়র্কভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইজরায়েল পলিসি ফোরামের বিশ্লেষক মাইকেল কপলো মনে করেন, কয়েকজন বামপন্থী কংগ্রেস সদস্য একা বড় পরিবর্তন আনবেন না। কিন্তু তাঁর মতে, ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতির মূল স্রোতেই এখন ইজরায়েল-বিরোধী অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, “ইজরায়েলের বিরোধিতা আর প্রান্তিক বিষয় নয়। এটি এখন নির্বাচনী প্রচার ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রে চলে এসেছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাথমিক পর্বেও এই প্রশ্ন বড় ইস্যু হতে পারে। এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে, যেখানে দুই প্রধান দলের প্রার্থীরা অন্য অনেক বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করলেও ইজরায়েল-নীতি পরিবর্তনের প্রশ্নে একমত হবেন।
ডেমোক্র্যাটদের একাংশের মতে, মানবাধিকার এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণের কারণে দুই দেশের মূল্যবোধের মিল আর আগের মতো নেই। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের একটি অংশের অভিযোগ, ইজরায়েলের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে আমেরিকাকেও বারবার মূল্য দিতে হচ্ছে, যার সাম্প্রতিক উদাহরণ ইরান সংকট।
ইজরায়েলের প্রাক্তন কূটনীতিক আলোন পিনকাসের প্রশ্ন, “চার দশক ধরে ইজরায়েল নিজেকে আমেরিকার কৌশলগত সম্পদ বলে এসেছে। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠছে—ইজরায়েল কি এখনও সম্পদ, নাকি ধীরে ধীরে বোঝা হয়ে উঠছে?”
তাঁর মতে, যদি সাধারণ আমেরিকান মনে করেন যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তাঁদের জ্বালানির দাম বাড়ছে বা অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে, তবে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও প্রশ্ন তুলবেন—এই সম্পর্ক থেকে আমেরিকা আসলে কী পাচ্ছে?
তবে এখনও মার্কিন-ইজরায়েল সম্পর্ক ভেঙে পড়ার মতো অবস্থায় পৌঁছায়নি। ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক সাহায্য বাড়িয়েছে, অস্ত্র বিক্রি ত্বরান্বিত করেছে, হামাসের সঙ্গে আলোচনায় ইজরায়েলের পাশে থেকেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ইজরায়েল-বিরোধী আন্দোলন দমনে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবু বাস্তবতা বদলাচ্ছে। ইরানের সঙ্গে আলোচনার কারণে ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই লেবাননে ইজরায়েলের সামরিক পদক্ষেপে সংযম দেখাতে চাপ দিচ্ছে যা কয়েক বছর আগেও অনেক ইজরায়েলির কল্পনার বাইরে ছিল।
এমনকি নেতানিয়াহুও সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে মার্কিন সামরিক সাহায্যের উপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমাতে হবে।
ভবিষ্যতে কংগ্রেস বা হোয়াইট হাউস অসন্তুষ্ট হলে পশ্চিম তীরের বসতি স্থাপনকারীদের সহায়তাকারী সংস্থাগুলির কর-ছাড় বাতিল করা, কিংবা জাতিসংঘে ইজরায়েল-বিরোধী প্রস্তাবে ভেটো না দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল কার্টজারের মতে, ট্রাম্প অত্যন্ত অনিশ্চিত সিদ্ধান্তের জন্য পরিচিত। তাই তিনি রাজনৈতিক সুবিধা দেখলে ইজরায়েলের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিতে পারেন।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতা এখন ইজরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ঢুকে পড়েছে। আসন্ন নির্বাচনের আগে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট বলেছেন, প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম আমেরিকায় ইজরায়েলের ভাবমূর্তি এতটা নেতিবাচক হয়ে উঠেছে এবং এই সম্পর্ক পুনর্গঠন করা আগামী সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
তাঁর কথায়, “ইজরায়েল আজ আমেরিকায় একটি নেতিবাচক রাজনৈতিক বোঝায় পরিণত হয়েছে। এটি আমাদের জন্য এক গভীর সংকট।”
ইজরায়েলের অনেকের কাছেই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সামরিক সাহায্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমেরিকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ছায়া হারানোর আশঙ্কা। কারণ, তাদের বিশ্বাস—অস্ত্রের জোগান হয়তো অন্যভাবে মেটানো সম্ভব, কিন্তু বিশ্বের সামনে সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্রের নিরঙ্কুশ সমর্থন হারালে তার মূল্য অনেক বেশি।