হাইলাইটস
- হামলার অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকেই পরিকল্পনা শুরু করেছিল জঙ্গিরা।
- দুটি মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণে মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রমাণ।
- বিশেষ একটি অ্যাপ ব্যবহার করে হামলার স্থানাঙ্ক (কো-অর্ডিনেট) পাকিস্তানে থাকা হ্যান্ডলারের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
- ফোনে মিলেছে জঙ্গিদের ছবি, কথোপকথন ও হামলার প্রস্তুতির নানা তথ্য।
- এনআইএ-র মতে, গোটা অভিযান ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং প্রযুক্তিনির্ভর।
পহেলগামে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা ঘটনার অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি)-র হাতে আসা গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রমাণে উঠে এসেছে, হামলার আগে জঙ্গিরা একটি মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে হামলার সম্ভাব্য স্থান ও চলাচলের পথের সুনির্দিষ্ট অবস্থান পাকিস্তানে থাকা তাদের হ্যান্ডলারের কাছে পাঠিয়েছিল। তদন্তকারীদের মতে, এই তথ্য থেকেই স্পষ্ট যে হামলাটি ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি, নজরদারি এবং প্রযুক্তির সাহায্যে পরিচালিত একটি সুসংগঠিত সন্ত্রাসী অভিযান।
তদন্তে উদ্ধার হওয়া দুটি মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এনআইএ জানতে পেরেছে, হামলার আগে জঙ্গিরা একাধিকবার ঘটনাস্থলে গিয়ে রেকি চালায়। সেই সময় তোলা ছবি, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং বিভিন্ন বার্তা একটি এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে হ্যান্ডলারের কাছে পাঠানো হয়। এর মাধ্যমে হামলার রুট, নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান এবং সম্ভাব্য লক্ষ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আদানপ্রদান হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের ধারণা। ফরেনসিক পরীক্ষায় মোবাইল ফোন দুটিতে জঙ্গিদের একাধিক ছবি উদ্ধার হয়েছে। এছাড়া উদ্ধার হয়েছে হ্যান্ডলারের সঙ্গে কথোপকথনের নথি, যেখানে হামলার প্রস্তুতি, সময় নির্বাচন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর গতিবিধি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে তদন্তে জানা গেছে। যদিও তদন্তের স্বার্থে এনআইএ এই বার্তাগুলির পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেনি।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, জঙ্গিরা সাধারণ বার্তা পাঠানোর পরিবর্তে এমন একটি অ্যাপ ব্যবহার করেছিল, যা অবস্থান নির্ভুলভাবে ভাগ করে নেওয়ার সুবিধা দেয় এবং যোগাযোগকে গোপন রাখে। এর ফলে নিরাপত্তা সংস্থার নজর এড়িয়ে পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা এখন ওই অ্যাপের ব্যবহার, তথ্য আদানপ্রদানের সময় এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশি সংযোগের পূর্ণ চিত্র পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। এনআইএ-র তদন্তে আরও জানা গেছে, হামলার আগে কয়েক দিন ধরে এলাকায় একাধিকবার যাতায়াত করা হয়েছিল। সেই সময় কোন রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করা হবে, কোথায় অবস্থান নেওয়া হবে এবং কীভাবে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করা সম্ভব—এসব বিষয় নিয়েও পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মোবাইল ফোনে থাকা অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য এবং ছবিগুলি এই প্রস্তুতির সঙ্গে মিল খেয়েছে।
তদন্তকারীদের মতে, হামলার পরিকল্পনায় স্থানীয় সহযোগিতার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ, এলাকা সম্পর্কে এত বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং নজরদারি চালাতে স্থানীয় স্তরে কিছু সহায়তা পাওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে এই বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি। ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতে এনআইএ এখন হ্যান্ডলারের পরিচয়, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক এবং সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে। তদন্তকারীদের বিশ্বাস, উদ্ধার হওয়া তথ্য শুধু এই হামলার নয়, ভবিষ্যতে একই ধরনের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতেও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠতে পারে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে জঙ্গি সংগঠনগুলি পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের জন্য ক্রমশ ডিজিটাল প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ, অবস্থান ভাগ করে নেওয়ার অ্যাপ এবং মোবাইলভিত্তিক তথ্য আদানপ্রদান নিরাপত্তা সংস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। পহেলগাম হামলার তদন্তেও সেই প্রবণতারই স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এনআইএ-র তদন্ত এখনও চলমান। তদন্তকারীরা আশা করছেন, মোবাইল ফোন থেকে উদ্ধার হওয়া তথ্য, ডিজিটাল বার্তা, ছবি এবং অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে হামলার পূর্ণ ষড়যন্ত্র, জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং সীমান্তপারের মদতের বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসবে। বর্তমানে এই ডিজিটাল প্রমাণকেই মামলার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।