হাইলাইটস
- ভারতের আরোপিত শুল্কের হার নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
- নতুন বইয়ে দাবি, বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল তাঁর।
- ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল, ভারত মার্কিন পণ্যের উপর সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি শুল্ক বসায়।
- ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের তথ্য সামনে আসার পরেও সন্তুষ্ট হননি ট্রাম্প।
- ঘটনাটি তুলে ধরা হয়েছে সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জনাথন সোয়ানের নতুন বইয়ে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কনীতিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে ভারত, চিন এবং ইউরোপীয় দেশগুলির বিরুদ্ধে তিনি বহুবার অভিযোগ তুলেছেন যে তারা মার্কিন পণ্যের উপর অন্যায্যভাবে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে। এবার একটি নতুন বইয়ে দাবি করা হয়েছে, ভারতের শুল্কনীতি নিয়ে তাঁর ক্ষোভ এতটাই তীব্র ছিল যে তিনি নিজের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের সঙ্গেই প্রকাশ্যে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছিলেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের দুই সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জনাথন সোয়ান রচিত “Regime Change: Inside the Imperial Presidency of Donald Trump” বইয়ে এই ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। বই অনুযায়ী, ট্রাম্প দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে ভারত মার্কিন পণ্যের উপর যে শুল্ক আরোপ করে, তার প্রকৃত হার সরকারি নথিতে দেখানো সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। তাঁর ধারণা ছিল, আমলাতন্ত্র ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকৃত তথ্য আড়াল করছে এবং তাঁকে ভুল সংখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
বইয়ে উদ্ধৃত একটি বক্তব্যে ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, “কেউ আমাকে কোনও সঠিক সংখ্যা দেয়নি। চিন আমাদের উপর কত শুল্ক বসায়, ভারত কত শুল্ক বসায়—তার কঠিন তথ্য কোথায়? তোমরা আমাকে সব বাজে সংখ্যা দিচ্ছ।” এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, শুল্ক সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে তিনি কতটা অসন্তুষ্ট ছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের কাছে ভারতের শুল্কহার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চান। সেই সময় বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক মার্কিন ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ বা ইউএসটিআরের নথিভুক্ত তথ্য তাঁর সামনে পেশ করেন। কিন্তু সেই সরকারি পরিসংখ্যান দেখেও ট্রাম্প সন্তুষ্ট হননি। বরং তিনি আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং অভিযোগ করেন যে তাঁর প্রশাসন তাঁকে প্রকৃত তথ্য না দিয়ে বিভ্রান্ত করছে।
বইয়ের লেখকদের দাবি, ট্রাম্পের ধারণা ছিল ভারতের বাজারে মার্কিন পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে যে বাধাগুলি রয়েছে, সেগুলি সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। ফলে ইউএসটিআরের তথ্য তাঁর প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। সেই কারণেই তিনি লুটনিকের উপর চড়াও হন এবং প্রশাসনের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
ভারতকে নিয়ে ট্রাম্পের এই মনোভাব অবশ্য নতুন নয়। তাঁর প্রথম প্রেসিডেন্ট পদে থাকার সময়ও তিনি ভারতকে “ট্যারিফ কিং” বা “শুল্কের রাজা” বলে উল্লেখ করেছিলেন। হার্লে-ডেভিডসনের মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে বিভিন্ন কৃষিজ ও শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে ভারতীয় শুল্কহার নিয়ে তিনি একাধিকবার প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, ভারতীয় বাজারে মার্কিন সংস্থাগুলির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়নি।
অন্যদিকে ভারত বরাবরই যুক্তি দিয়েছে যে শুল্কনীতি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, কৃষি সুরক্ষা এবং শিল্পোন্নয়নের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। পাশাপাশি নয়াদিল্লি বারবার বলেছে, ভারত ও আমেরিকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই বইয়ে প্রকাশিত ঘটনাটি আরও একবার দেখিয়ে দিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং আক্রমণাত্মক ছিল। তিনি প্রায়ই সরকারি সংস্থার তথ্যের চেয়ে নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। ফলে অর্থনীতি বা বাণিজ্যের মতো জটিল বিষয়ে তাঁর প্রশাসনের ভেতরেও মতবিরোধ তৈরি হতো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি। সেই কারণেই তিনি যে কোনও বাণিজ্য ঘাটতি বা উচ্চ শুল্ককে সরাসরি আমেরিকার স্বার্থবিরোধী বলে মনে করতেন। ভারতের ক্ষেত্রে তাঁর ক্ষোভের পেছনেও সেই মানসিকতাই কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন বইয়ে উঠে আসা এই ঘটনাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত রাগের মুহূর্ত নয়, বরং ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরে নীতি নির্ধারণের ধরন, তথ্যের প্রতি তাঁর সন্দেহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। ভারতের শুল্কনীতি নিয়ে তাঁর ক্ষোভ যে বহুদিনের, এই বই সেই ধারণাকেই আরও জোরালোভাবে সামনে এনেছে।