হাইলাইটস
- ছয় সাংসদের দলত্যাগে নতুন সংকটে উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা (ইউবিটি)।
- ২০২২ সালের একনাথ শিন্ডে বিদ্রোহের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে সাংগঠনিক শক্তি হারিয়েছে দল।
- দলীয় নাম ও প্রতীক হারানোর ধাক্কা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি উদ্ধব শিবির।
- মহারাষ্ট্রে বিজেপির ক্রমবর্ধমান প্রভাব আঞ্চলিক দলগুলির অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
- বর্তমান সংকট শুধু সাংসদ হারানোর ঘটনা নয়, বরং ‘সেনা’ ধারণার ক্ষয়িষ্ণুতার প্রতীক।
- বালাসাহেব ঠাকরের তৈরি রাজনৈতিক আবেগ আজ আর আগের মতো সংগঠনকে একত্রে ধরে রাখতে পারছে না।
মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে শিবসেনা শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, একটি আবেগ, একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের নাম। ১৯৬৬ সালে বালাসাহেব ঠাকরের হাত ধরে যে দলের জন্ম হয়েছিল, আগামী বছর সেই দল ষাট বছরে পা দেবে। কিন্তু এই ঐতিহাসিক মাইলফলকের ঠিক আগে দলটি হয়তো তার সবচেয়ে গভীর অস্তিত্বসংকটের মুখোমুখি।
উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা (ইউবিটি) থেকে ছয় সাংসদের বেরিয়ে যাওয়া নিছক একটি দলবদলের ঘটনা নয়। এটি এমন এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অবক্ষয়ের সর্বশেষ অধ্যায়, যার শুরু হয়েছিল ২০২২ সালে একনাথ শিন্ডের বিদ্রোহের মাধ্যমে। সেই বিদ্রোহ শুধু মহারাষ্ট্রের সরকার বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল শিবসেনার রাজনৈতিক চরিত্র, সংগঠন এবং ভবিষ্যতের গতিপথ।
আজ প্রশ্নটা আর শুধু এই নয় যে কেন নেতারা দল ছাড়ছেন। তার থেকেও বড় প্রশ্ন—কীভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হল, যেখানে একসময়কার দুর্ধর্ষ সংগঠন এত সহজে ভেঙে পড়ছে?
বালাসাহেবের সময়ে শিবসেনার শক্তির মূল উৎস ছিল এক ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক আনুগত্য। মতাদর্শ, সংগঠন বা নির্বাচনী সমীকরণের চেয়েও বড় ছিল ‘সাহেব’-এর প্রতি অন্ধ বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসই শিবসেনাকে মুম্বইয়ের রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে মহারাষ্ট্রের ক্ষমতার অলিন্দ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল।
কিন্তু বালাসাহেবের মৃত্যুর পর সেই আবেগকে ধরে রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে। উদ্ধব ঠাকরে দলকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি প্রশাসনিক রাজনীতিকে গুরুত্ব দেন, জোট রাজনীতির পথে হাঁটেন এবং শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস ও এনসিপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে মহা বিকাশ আঘাড়ি সরকার গঠন করেন।
এই সিদ্ধান্তই দলের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষের বীজ বপন করেছিল।
অনেক শিবসেনা নেতা মনে করেছিলেন, হিন্দুত্বের প্রশ্নে দল তার ঐতিহ্যগত অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শিবসেনা তার নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় হারাচ্ছে। একনাথ শিন্ডে সেই অসন্তোষকেই রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেন।
২০২২ সালের বিদ্রোহ ছিল কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়। সেটি ছিল শিবসেনার আত্মপরিচয় নিয়ে সংঘর্ষ। বিদ্রোহের পর নির্বাচন কমিশন শিন্ডে গোষ্ঠীকেই প্রকৃত শিবসেনা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দলীয় প্রতীক ‘ধনুক-তীর’-ও চলে যায় তাদের হাতে।
ভারতীয় রাজনীতিতে দলীয় নাম ও প্রতীক হারানো শুধু আইনি পরাজয় নয়, মানসিক ধাক্কাও বটে। বিশেষ করে এমন একটি দলের ক্ষেত্রে, যার সমগ্র রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিং কয়েক দশক ধরে একটি নির্দিষ্ট প্রতীক ও পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে।
উদ্ধব ঠাকরের শিবির সেই আঘাত থেকে আর পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
লোকসভা নির্বাচনে কিছুটা সাফল্য এলেও সাংগঠনিক দুর্বলতা থেকেই গিয়েছে। বহু নেতা ও কর্মীর মনে প্রশ্ন ছিল—দলের ভবিষ্যৎ কোথায়? বিজেপির বিরোধিতা করে কতদূর যাওয়া সম্ভব? ক্ষমতার বাইরে থেকে কতদিন সংগঠন টিকিয়ে রাখা যাবে?
সাম্প্রতিক সাংসদ বিদ্রোহ সেই প্রশ্নগুলোকেই আরও জোরালো করেছে।
এই ঘটনাকে শুধু ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা রাজনৈতিক সুবিধাবাদের দৃষ্টিতে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা।
গত এক দশকে ভারতের রাজনীতিতে বিজেপি এমন এক সর্বগ্রাসী শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যার সামনে আঞ্চলিক দলগুলির পক্ষে নিজেদের সাংগঠনিক ও আর্থিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, বিপুল সাংগঠনিক সম্পদ, নির্বাচনী যন্ত্রণা এবং রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে বিজেপি এমন এক আকর্ষণকেন্দ্র তৈরি করেছে, যেখানে অনেক নেতা নিজেদের ভবিষ্যৎ বেশি নিরাপদ বলে মনে করেন।
মহারাষ্ট্রে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট।
একসময় কংগ্রেসের ঘাঁটি ভেঙেছে, পরে এনসিপি বিভক্ত হয়েছে, তারপর শিবসেনা। এখন উদ্ধব শিবিরের সাংসদদের দলত্যাগ সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
এক অর্থে শিবসেনা আজ সেই সমস্যার মুখোমুখি, যার শিকার ভারতের বহু আঞ্চলিক দল। তাদের প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের ক্যারিশমা ধীরে ধীরে ফিকে হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে পুরনো আবেগের আবেদন কমছে এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা ক্রমশ আরও নির্মম হয়ে উঠছে।
তবু উদ্ধব ঠাকরের সামনে এখনও কিছু সুযোগ রয়েছে।
প্রথমত, মহারাষ্ট্রের একাংশে এখনও ঠাকরে পরিবারের প্রতি আবেগ প্রবল। বালাসাহেবের উত্তরাধিকার পুরোপুরি মুছে যায়নি। দ্বিতীয়ত, বিজেপিবিরোধী ভোটের একটি বড় অংশ এখনও উদ্ধব ঠাকরেকে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখে। তৃতীয়ত, শহুরে মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা শিন্ডের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে বেশি।
কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে শুধু আবেগের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রয়োজন শক্তিশালী সাংগঠনিক পুনর্গঠন, নতুন নেতৃত্ব তৈরি এবং ভবিষ্যতের জন্য স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখা।
সবচেয়ে বড় কথা, উদ্ধব ঠাকরেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে ‘সেনা’ শব্দটির অর্থ। কারণ আজকের প্রজন্মের কাছে ১৯৬০ বা ১৯৯০-এর দশকের শিবসেনা আর একইভাবে প্রাসঙ্গিক নয়।
ছয় সাংসদের বিদায় তাই কেবল সংখ্যার হিসাব নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সংগঠনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মৌলিক প্রশ্নের প্রতিফলন—শিবসেনা কি শুধুই একটি দল, নাকি একটি ধারণা?
যদি তা কেবল একটি দল হয়, তাহলে ভাঙন আরও বাড়তে পারে। কিন্তু যদি তা এখনও একটি রাজনৈতিক ধারণা হয়ে থাকে, তাহলে পুনর্জন্মের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ষাট বছরে পা দেওয়ার আগে উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা যেন যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থাকা শেষ বাহিনী। চারদিক থেকে চাপ বাড়ছে, সৈন্য কমছে, দুর্গ ক্ষয়ে যাচ্ছে। তবু ইতিহাস বলে, অনেক সময় সবচেয়ে কঠিন লড়াই থেকেই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
আগামী কয়েক মাসই বলে দেবে, এটি কি শিবসেনার শেষ অধ্যায়, নাকি দীর্ঘ সংগ্রামের পর আরেকটি পুনরুত্থানের ভূমিকা।