হাইলাইটস:
- পার্লামেন্ট স্ট্রিটে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে পুলিশ।
- যন্তর-মন্তরে হাজার হাজার আন্দোলনকারীর সমাবেশে উত্তেজনা চরমে।
- টলস্টয় মার্গে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ।
- শিক্ষা সংস্কার, প্রশ্নফাঁসের তদন্ত এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন আরও তীব্র।
বাংলাস্ফিয়ার: রাজধানী দিল্লির রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু বৃহস্পতিবার কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল আন্দোলনকারীদের ঢলে। পার্লামেন্ট স্ট্রিট, যন্তর-মন্তর এবং টলস্টয় মার্গ জুড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টানটান উত্তেজনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের ধস্তাধস্তি, ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা এবং দফায় দফায় সংঘর্ষে গোটা এলাকা রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়।
সকালের পর থেকেই যন্তর-মন্তরে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-যুব, অভিভাবক এবং বিভিন্ন সংগঠনের সমর্থক জড়ো হতে শুরু করেন। দুপুর গড়াতেই সমাবেশের আকার এতটাই বেড়ে যায় যে পুলিশকে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করতে হয়। দিল্লি পুলিশের পাশাপাশি র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স, সিআরপিএফ এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় বাহিনীকেও প্রস্তুত রাখা হয়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি অবহেলার বিরুদ্ধে তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছেন। কিন্তু প্রশাসন তাঁদের দাবি শোনার পরিবর্তে বলপ্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে। তাঁদের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে প্রশ্নফাঁসের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।
পুলিশের দাবি অবশ্য ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, নির্দিষ্ট জায়গার বাইরে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং নিরাপত্তা বলয় ভাঙার উদ্যোগ নেওয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সংসদ ভবন এবং আশপাশের উচ্চ-নিরাপত্তা অঞ্চলে অননুমোদিত জমায়েত ঠেকাতে বাধ্য হয়েই ন্যূনতম বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, একাধিকবার সতর্ক করার পরও বিক্ষোভকারীরা এগিয়ে আসতে থাকলে কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করা হয়।
পার্লামেন্ট স্ট্রিটে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে যখন একদল আন্দোলনকারী ব্যারিকেড সরিয়ে সংসদমুখী হওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশ প্রথমে মানবশৃঙ্খল তৈরি করে তাঁদের আটকানোর চেষ্টা করে। পরে জলকামান ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে ভিড় ছত্রভঙ্গ করা হয়। গ্যাসের ধোঁয়ায় গোটা এলাকা ঢেকে যায়। বহু মানুষ চোখে জ্বালা ও শ্বাসকষ্টের অভিযোগ করেন। স্বেচ্ছাসেবক এবং চিকিৎসাকর্মীরা ঘটনাস্থলেই প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
একই সময়ে টলস্টয় মার্গে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায়। সেখানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কয়েকজন আন্দোলনকারী ব্যারিকেড টপকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের আটকায়। এরপরই দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
যন্তর-মন্তরে এ দিনও আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সমর্থকেরা। ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থা, তাঁকে ঘিরে চলা বিতর্ক এবং আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর পুলিশের আগের অভিযানের প্রসঙ্গও বারবার উঠে আসে বক্তৃতায়। বক্তারা দাবি করেন, এই আন্দোলন কোনও একক ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
বিরোধী দলগুলিও এ দিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকারকে দমন করতে প্রশাসন অযথা শক্তি প্রয়োগ করছে। সরকারের উচিত ছিল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসা, সংঘর্ষের পরিবেশ তৈরি করা নয়।
অন্যদিকে কেন্দ্রের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে কোনও বাধা নেই, কিন্তু সংসদ ও সংবেদনশীল সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে দেওয়া যায় না। সরকার দাবি করেছে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশের প্রধান দায়িত্ব। যারা আইন ভেঙে নিরাপত্তা বলয় অতিক্রমের চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দিল্লি পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি সারাক্ষণ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত ব্যারিকেড বসানো হয়েছে এবং ড্রোন ও সিসিটিভির মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে যান চলাচলেও ব্যাপক প্রভাব পড়ে। বহু রাস্তা ঘুরিয়ে দেওয়ায় অফিসযাত্রী এবং সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে হয়।
দিনের শেষে যন্তর-মন্তরে এখনও বিপুল সংখ্যক আন্দোলনকারী অবস্থান চালিয়ে যান। আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কর্মসূচি চলবে। অন্যদিকে পুলিশও স্পষ্ট করেছে, আইনশৃঙ্খলা ভাঙার যে কোনও প্রচেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে।
ফলে রাজধানীর রাজনৈতিক অক্ষ—যন্তর-মন্তর থেকে পার্লামেন্ট স্ট্রিট—এখন কেবল একটি বিক্ষোভস্থল নয়, বরং সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্রমশ গভীরতর হয়ে ওঠা সংঘাতের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহই ঠিক করবে, এই অচলাবস্থার পরিণতি আলোচনার টেবিলে গিয়ে মিটবে, নাকি আরও বড় রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেবে।