জিডিপি পরিসংখ্যানে ধোঁয়াশা, সরকারের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন গর্গের

যা জানা জরুরি
- ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, ভোগব্যয় এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকের বড় অসংগতি রয়েছে বলে মনে করেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থসচিব…
- দ্য হিন্দুকে দেওয়া লিখিত সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্য, হিসাবের পদ্ধতি বদলেছে বললেই এই ফারাকের ব্যাখ্যা হয় না।
- অর্থনীতির আয়তন কেন সংশোধনের পরে এতটা কমল, কোন তথ্য বদলাল এবং আগের হিসাব কোথায় ভুল ছিল, সরকারকে স্পষ্ট করে জানাতে হবে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, ভোগব্যয় এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকের বড় অসংগতি রয়েছে বলে মনে করেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গ। দ্য হিন্দুকে দেওয়া লিখিত সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্য, হিসাবের পদ্ধতি বদলেছে বললেই এই ফারাকের ব্যাখ্যা হয় না। অর্থনীতির আয়তন কেন সংশোধনের পরে এতটা কমল, কোন তথ্য বদলাল এবং আগের হিসাব কোথায় ভুল ছিল, সরকারকে স্পষ্ট করে জানাতে হবে।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে জিডিপি বা মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের নতুন হিসাব। সরকারের যুক্তি, তথ্য সংগ্রহের পরিধি বৃদ্ধি, উন্নত পদ্ধতি এবং নতুন সূচক ব্যবহারের ফলে সংশোধন প্রয়োজন হয়েছে। গর্গের আপত্তি, এই সাধারণ ব্যাখ্যা নির্দিষ্ট অঙ্কের পরিবর্তন বুঝতে সাহায্য করছে না। তাঁর মতে, বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সংশোধনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের প্রকাশ্য হিসাব এবং পুরনো ও নতুন পরিসংখ্যানের মধ্যে তুলনার সুযোগ।
সেই কারণেই ২০১১–১২ ভিত্তিবর্ষের পুরনো হিসাবের সঙ্গে ২০২২–২৩ ভিত্তিবর্ষের নতুন হিসাবের স্বচ্ছ সংযোগ দাবি করেছেন তিনি। গর্গ চান, নতুন পদ্ধতি অনুসারে ২০১১–১২ থেকে ২০২১–২২ সালের অর্থনীতির পুনর্গণিত পরিসংখ্যান প্রকাশের সময়সূচি ঘোষণা করুক পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রক। তাঁর অভিযোগ, এমন কর্মসূচি এখনও ঘোষণা না হওয়ায় সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই তুলনামূলক তথ্য ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বিচার কঠিন।
সাক্ষাৎকারে ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকের জিডিপিতে প্রায় ছয় লক্ষ কোটি টাকার সংশোধনের প্রশ্ন ওঠে। উত্তরে গর্গ বলেন, চলতি মূল্যে জিডিপি কমে যাওয়ার বিষয়টির সূত্র ২০২২–২৩ থেকে ২০২৪–২৫ সালের হিসাবে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৪–২৫ সালের জিডিপিই কমানো হয়েছে ১২ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকা। কেন এত বড় সংশোধন প্রয়োজন হল, সরকার তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।
গর্গের যুক্তি, তথ্য সংগ্রহের আওতা বাড়লে সাধারণত আগে বাদ পড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসাবে যুক্ত হওয়ার কথা। ফলে শুধু পরিধি বৃদ্ধির কথা বলে অর্থনীতির আয়তন কমে যাওয়া বোঝানো যায় না। তাঁর মূল্যায়নে দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে: আগের হিসাবে একই বিষয় একাধিকবার গণনা বা অন্য ভুল হয়েছিল; অথবা বেশি বৃদ্ধি দেখাতে ইচ্ছাকৃতভাবে জিডিপি বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল, পরে নতুন হিসাব চালুর সুযোগে কমানো হয়েছে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি গুরুতর অভিযোগ; সাক্ষাৎকারে গর্গ একে নিজের মূল্যায়ন হিসেবেই পেশ করেছেন। ইচ্ছাকৃত বিকৃতির অভিযোগ যে স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়েছে, দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে তা বলা যায় না। তবে তাঁর বক্তব্য, সরকার নিজেই অর্থনীতির আয়তন কমিয়ে সংশোধিত হিসাব প্রকাশ করেছে। ফলে আগের অতিমূল্যায়নের উৎস ব্যাখ্যা করার দায়ও সরকারের। তিনি আরও আশঙ্কা করছেন, নিচু তুলনাভিত্তি ভবিষ্যতের বৃদ্ধির হার বেশি দেখাতে সাহায্য করতে পারে।
মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাদ দিয়ে প্রকৃত উৎপাদন বৃদ্ধির হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন প্রাক্তন অর্থসচিব। এখানে ব্যবহৃত মূল্যসমন্বয় সূচকটি ‘জিডিপি ডিফ্লেটর’ নামে পরিচিত। গর্গের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, উপভোক্তা মূল্যস্ফীতি চার শতাংশের বেশি এবং উৎপাদক মূল্যস্ফীতি নয় শতাংশ হলেও প্রথম ত্রৈমাসিকে এই সূচক আড়াই শতাংশ। তাঁর প্রশ্ন, বাকি পণ্য ও পরিষেবায় কতটা কম মূল্যবৃদ্ধি অথবা মূল্যহ্রাস ঘটলে সামগ্রিক সূচক এত নিচে নামতে পারে?
এই তুলনা থেকে তাঁর সিদ্ধান্ত, হিসাবের ভিতরে গুরুতর অসংগতি রয়েছে, যার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কোন ক্ষেত্রের মূল্য কতটা বদলেছে এবং সামগ্রিক হিসাবে তার প্রভাব কতখানি, সেই তথ্য প্রকাশের দাবি করেছেন তিনি। বিষয়টির গুরুত্ব হল, চলতি মূল্যের উৎপাদন থেকে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কতটা বাদ দেওয়া হচ্ছে, তার উপর প্রকৃত বৃদ্ধির হার নির্ভর করে। তাই মূল্যসমন্বয়ের ত্রুটি বৃদ্ধির মূল্যায়নও বদলে দিতে পারে।
উৎপাদিত পণ্য এবং উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণের মূল্যপরিবর্তন আলাদাভাবে সমন্বয়ের পদ্ধতি নিয়েও তাঁর সংশয় রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘ডাবল ডিফ্লেশন’। গর্গের বক্তব্য, কোনও পদ্ধতি বিশ্বে গ্রহণযোগ্য হলেই ভারতে তা সহজে কার্যকর করা যাবে, এমন নয়। আগে যথেষ্ট খুঁটিনাটি ও নির্ভরযোগ্য উৎপাদন, উপকরণ এবং দামের তথ্য তৈরি করতে হবে। সেই প্রস্তুতি ছাড়া পদ্ধতির পরিবর্তন নতুন সমস্যাও আনতে পারে।
তাঁর পরামর্শ, নতুন ব্যবস্থা স্থিতিশীল হয়ে বিশ্বাসযোগ্য ফল না দেওয়া পর্যন্ত পুরনো ও নতুন পদ্ধতি পাশাপাশি চালানো উচিত। অন্তর্বর্তী সময়ে পুরনো পদ্ধতির মূল্যসমন্বয় সূচক ব্যবহারের পক্ষেও মত দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, কয়েকটি নির্বাচিত ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করে বাকিগুলিতে না করলে সামগ্রিক ফল বিকৃত হতে পারে। কারণ, একটি ক্ষেত্রের উৎপাদন অন্য ক্ষেত্রের উপকরণ হয়; তাদের মূল্যপরিবর্তন যথাযথভাবে ধরা জরুরি।
পরিসংখ্যানের সমস্যা কি প্রধানত তথ্য পরিকাঠামোর দুর্বলতা? গর্গের উত্তর, বিপুল আধুনিকীকরণ প্রয়োজন হলেও বর্তমান ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্য তথ্য উৎপাদনের সামর্থ্য রয়েছে। শর্ত হল, ফলাফলকে কোনও নির্দিষ্ট দিকে নিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক আগ্রহ থাকতে পারবে না। তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং প্রকাশের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানবিদদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীনতা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, প্রযুক্তিগত সংস্কারের পাশাপাশি এই প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাও অত্যন্ত জরুরি।
উচ্চ জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্বল পারিবারিক আয়, কর্মসংস্থান বা আর্থিক আস্থার সহাবস্থান নিয়ে গর্গ বলেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সূচকের মধ্যে ফারাক হতেই পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট ফলাফল রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠলে এবং ব্যবস্থা সেই কাঙ্ক্ষিত ফল তৈরির চাপে পড়লে, অসংগতিকে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তাঁর মূল আপত্তি এখানেই: জিডিপির সঙ্গে অন্য তথ্যশ্রেণির বড় অমিলের বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা চাই।
অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং মানুষের কল্যাণের সম্পর্ক বোঝার জন্য আয়ের বণ্টন জানা প্রয়োজন বলেও মনে করেন গর্গ। তাঁর বক্তব্য, জিডিপির আয়ভিত্তিক দিকটি যথাযথভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে না। উৎপাদিত মূল্য থেকে শ্রমিক ও কর্মীরা বেতন বা মজুরি হিসেবে কত পাচ্ছেন, সংস্থাগুলির মুনাফা কত এবং সরকার পণ্যের কর হিসেবে কত পাচ্ছে, সেই চিত্র প্রয়োজন। তা ছাড়া বৃদ্ধির সুফল কার কাছে যাচ্ছে, বোঝা কঠিন।
ভারতের মাথাপিছু উৎপাদন এখনও খুব কম বলে তাঁর অভিমত। সেই কারণে নয় থেকে দশ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্য, ধনীদের উপর কর এবং আয়করের আওতা বাড়িয়ে আয় পুনর্বণ্টনের কথা বলেছেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারের অত্যন্ত অনুৎপাদনশীল বিনিয়োগব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, বৃদ্ধির অভিমুখ মানুষের দিকে ফেরাতে হবে। এগুলি গর্গের নীতিগত সুপারিশ; সরকারি হিসাব সংশোধনের ব্যাখ্যা থেকে পৃথক অর্থনৈতিক অবস্থান।
ভুল বা বদলে যাওয়া পরিসংখ্যানের দায় কে নেবে, সেই প্রশ্নে গর্গের উত্তর তীব্র: সরকারের মধ্যে কেউ দায় স্বীকার করেন বলে তিনি মনে করেন না। তাঁর আশঙ্কা, বিনিময়মূল্য এবং শেয়ারবাজারে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি একটি শর্তাধীন হিসাবও দেন: উল্লিখিত প্রথম ত্রৈমাসিকের আগের জিডিপি ৮৬ লক্ষ কোটি টাকা ধরে তুলনা করলে চলতি মূল্যে বৃদ্ধি দাঁড়ায় ২.৬ শতাংশ, প্রকৃত বৃদ্ধি প্রায় শূন্য। এটি আগের ভিত্তি ধরে তাঁর গণনা, সংশোধিত সরকারি বৃদ্ধির স্বতন্ত্র যাচাই নয়।
সরকারের ঘোষিত ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির হার নিয়ে তাঁর আপত্তির কেন্দ্রে তাই শুধু একটি সংখ্যা নেই; রয়েছে সেই সংখ্যায় পৌঁছনোর পথ এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে তার সম্পর্ক। পরিসংখ্যান মন্ত্রক ও অর্থ মন্ত্রকের জবাবকে তিনি আমলাতান্ত্রিক ভাষায় বিষয়টি অস্পষ্ট করার চেষ্টা বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, অর্থনীতির আয়তন কমানোর কারণ পরিষ্কার হয়নি। সাক্ষাৎকার থেকে উঠে আসা প্রধান প্রশ্ন হল, নতুন পদ্ধতি সত্যিই উন্নত হলে তার ফল কেন বদলাল, তা প্রকাশ্যে দেখানো হচ্ছে না কেন? পুরনো হিসাবের ভুল, নতুন তথ্যের প্রভাব এবং সংশোধনের পরিমাণ আলাদা করে জানানোই এই বিতর্কে সরকারের কাছে তাঁর প্রত্যাশিত জবাব।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



