উর্দু দৈনিকের অর্থ লেনদেনে নাদিমুলের বাড়িতে ইডি, ‘প্রতিহিংসা’ বলছে তৃণমূল

যা জানা জরুরি
- উর্দু দৈনিকের আর্থিক লেনদেন ঘিরে তদন্তে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মহম্মদ নাদিমুল হকের বাড়ি ও দফতরে তল্লাশি চালাল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট।
- সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর কলকাতা, দিল্লি ও রাঁচির সাতটি ঠিকানায় অভিযান হয়।
- তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে ‘আখবার-এ-মশরিক’ পত্রিকার প্রকাশক সংস্থা এবং তার সঙ্গে যুক্ত অর্থের উৎস ও লেনদেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
উর্দু দৈনিকের আর্থিক লেনদেন ঘিরে তদন্তে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মহম্মদ নাদিমুল হকের বাড়ি ও দফতরে তল্লাশি চালাল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর কলকাতা, দিল্লি ও রাঁচির সাতটি ঠিকানায় অভিযান হয়। তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে ‘আখবার-এ-মশরিক’ পত্রিকার প্রকাশক সংস্থা এবং তার সঙ্গে যুক্ত অর্থের উৎস ও লেনদেন। তৃণমূলের অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত নেতাদের চাপে ফেলতেই কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিজেপি অবশ্য এই অভিযানকে স্বাভাবিক তদন্তের অংশ বলে সমর্থন করেছে।
তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটে দায়ের হওয়া একটি এফআইআরের ভিত্তিতে আর্থিক তছরুপ প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছে ইডি। অভিযোগে বেআইনি আর্থিক লেনদেন, হিসাববহির্ভূত নগদ এবং সন্দেহজনক উৎস থেকে অর্থ পাওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে, এমন বিষয়বস্তু প্রকাশ ও প্রচারের অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এই সমস্ত অভিযোগ তদন্তাধীন।
নাদিমুল ‘আখবার-এ-মশরিক প্রাইভেট লিমিটেড’-এর অন্যতম পরিচালক। সাংসদের পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী। সংবাদপত্রটি ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁর বাবা মহম্মদ ওয়াসিমুল হক। পূর্ব ভারতের উর্দুভাষী পাঠকদের কাছে পরিচিত এই দৈনিককে ঘিরে তদন্ত শুরু হওয়ায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নও তুলেছে তৃণমূল। দলের দাবি, সংবাদপত্র পরিচালনার কারণেও নাদিমুল ও তাঁর পরিবারকে নিশানা করা হচ্ছে।
তল্লাশির সময় নাদিমুল দিল্লিতে ছিলেন না। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে তিনি জানান, সংসদের সরকারি প্রতিশ্রুতি সংক্রান্ত কমিটির সফরে রাঁচিতে ছিলেন। তার আগের দিন কমিটির সঙ্গে পটনায় গিয়েছিলেন। নিজের সরকারি বাসভবনে ইডি অভিযানের বিষয়টি কমিটির চেয়ারম্যান এম থাম্বিদুরাইকে জানিয়েছেন বলেও জানান সাংসদ। তবে তদন্তকারী সংস্থার আর্থিক অভিযোগগুলির বিস্তারিত জবাব তাঁর তরফে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
দিল্লির ৬১, সাউথ অ্যাভিনিউয়ে নাদিমুলের সরকারি বাসভবনেও তল্লাশি হয়। এই ঠিকানা তৃণমূলের দলীয় কাজেও ব্যবহৃত হয়। ফলে অভিযানকে শুধু সাংসদের ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখছে না দল। ইডি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, সংবাদপত্রের দফতরের পাশাপাশি কলকাতা ও দিল্লিতে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যুক্ত ঠিকানাতেও তদন্তকারীরা পৌঁছন। নিরাপত্তায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন ছিল।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে ইডি সূত্রের দাবি, তদন্তের আওতায় থাকা লেনদেনে তৃণমূলের অর্থও জড়িত থাকতে পারে। গত মাসে বিধাননগর পুলিশের কাছে অভিযোগ জমা পড়েছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। নাদিমুলের দফতরকে কেন্দ্র করে বেনামি লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। তবে দলীয় অর্থের সঙ্গে সংবাদপত্রের হিসাবের কী যোগসূত্র, তা এখনও প্রকাশ্য তথ্য থেকে পরিষ্কার নয়। এই অভিযোগের সমর্থনে তদন্তকারী সংস্থার প্রমাণও সামনে আসা বাকি।
ইডির আধিকারিকদের দাবি, সরকারি বিজ্ঞাপন পাওয়ার জন্য সংবাদপত্রটির প্রচারসংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। তাঁদের আরও অভিযোগ, পূর্বতন তৃণমূল সরকারের কাছ থেকে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মাধ্যমে প্রকাশক সংস্থাটি বিপুল অর্থ পেয়েছিল। ওই বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে দুবাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ রয়েছে বলেও দাবি তদন্তকারীদের। এই দাবিগুলির ভিত্তিতেই বিজ্ঞাপনের আয় এবং সংশ্লিষ্ট অর্থের গতিপথ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে উঠে এসেছে নগদের হিসাবের প্রশ্নও। সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, ইডি আধিকারিকদের দাবি অনুযায়ী, সংস্থার হিসাবে দেড় কোটি টাকা হাতে নগদ থাকার উল্লেখ মিললেও তার সমপরিমাণ নগদের সমর্থন পাওয়া যায়নি। বিটকয়েন বিক্রেতাদের সঙ্গে কিছু লেনদেন এবং পরে ব্যক্তিগত ডিজিটাল ওয়ালেটে অর্থ সরানোর অভিযোগও খতিয়ে দেখছে সংস্থা। এগুলি তদন্তকারীদের বক্তব্য; প্রমাণিত অপরাধের বিবরণ নয়।
তদন্তকারীরা তিনশোর বেশি বড় অঙ্কের বিটকয়েন লেনদেনের সূত্র পরীক্ষা করছেন। নাদিমুলের সংস্থাগুলির সঙ্গে দুবাইয়ের ব্যাঙ্কের সম্ভাব্য যোগাযোগও তাঁদের নজরে রয়েছে। সরকারি বিজ্ঞাপনের অর্থ কোনও মধ্যবর্তী সংস্থার মাধ্যমে অন্যত্র সরানো হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। তবে সংশ্লিষ্ট অর্থের মোট পরিমাণ বা সমস্ত লেনদেনের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ্যে আসেনি।
তৃণমূলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েনের অভিযোগ, দিল্লিতে বাড়ি ধসে পড়ে পড়ুয়াদের মৃত্যুর ঘটনা থেকে নজর ঘোরাতেই এই অভিযান। তাঁর বক্তব্য, নাদিমুলের বাসভবনের পাশাপাশি দলের দিল্লির কাজকর্মের ঠিকানায় হানা দিয়ে রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে বিজেপি। সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধের চেষ্টার অভিযোগও করেন তিনি। ডেরেকের দাবি, পূর্ব ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উর্দু সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত পরিবারকে পরিকল্পিতভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
কুণাল ঘোষ এই তল্লাশিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে থাকা নেতাদেরই বেছে বেছে হেনস্থা করা হচ্ছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার বা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দিলে কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযানের মুখে পড়তে হয় না বলেও দাবি করেন তিনি। দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের সঙ্গে ইডির সক্রিয়তাকে সরাসরি যুক্ত করেছেন কুণাল।
বিজেপি নেত্রী কেয়া ঘোষ পাল্টা বলেন, আর্থিক তছরুপের সন্দেহ থাকলে তদন্ত ও তল্লাশি হওয়াই স্বাভাবিক। তদন্তকারী সংস্থা প্রয়োজন বুঝলে অভিযান চালাবে, তার মধ্যে রাজনীতি খোঁজার কারণ নেই। তাঁর অভিযোগ, নিজেদের দুর্নীতি আড়াল করতেই প্রতিহিংসার যুক্তি সামনে আনছে তৃণমূল। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও তৃণমূলকে আক্রমণ করে জানান, দলের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে তাঁরা ভাল-মন্দের কোনও পার্থক্য করেন না।
বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পরে তৃণমূলের সাংগঠনিক ও সংসদীয় নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের মধ্যেই এই অভিযান ঘটল। নাদিমুল এখনও মমতা-অনুগত শিবিরে রয়েছেন। ফলে আর্থিক তদন্তকে ঘিরে বিতর্কে দলের ভাঙনের প্রসঙ্গও সামনে এসেছে।
এখন তদন্তের মূল বিষয়, অভিযোগে উল্লিখিত অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কোন হিসাবে জমা পড়েছে এবং পরে কোথায় গিয়েছে। নথি ও বৈদ্যুতিন তথ্য সংগ্রহ করে সেই যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে ইডি। তল্লাশিতে ঠিক কী কী বাজেয়াপ্ত হয়েছে এবং তার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও অপেক্ষিত। রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যেও এই প্রশ্নগুলির উত্তরেই মামলার অগ্রগতি স্পষ্ট হবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



