জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্টে অতি দক্ষিণপন্থীদের জয় বৃহত্তর এক প্রবণতার অংশ। মূলধারার রাজনীতির নীতিগত ব্যর্থতা এবং অতি দক্ষিণপন্থী ধ্যানধারণাকে ক্রমশ স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার প্রবণতা এই উত্থানের চালিকাশক্তি।

সংখ্যাগুলিই সব বলে দিচ্ছে। অলটারনেটিভ ফ্যুর ডয়চল্যান্ড বা এএফডি এমন একটি দল, যারা নাৎসি প্রতীক ও চিত্রকল্প নিয়ে নাড়াচাড়া করে, ‘বংশসূত্রে জার্মান’ এবং ‘পাসপোর্টধারী জার্মান’-এর মধ্যে ফারাক টানে। এমনকি ফ্রান্সের অতি দক্ষিণপন্থী নেত্রী মারিন ল্য পেনের কাছেও দলটি অতিরিক্ত উগ্র। সেই এএফডিই রবিবার স্যাক্সনি-আনহাল্টের প্রাদেশিক নির্বাচনে নিজেদের ভোট প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৪৩.৮ শতাংশে পৌঁছে দিয়েছে।

অন্য দিকে, চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের মধ্য-দক্ষিণপন্থী দল সিডিইউয়ের ভোট ধসে নেমেছে ১৭.২ শতাংশে। পাঁচ বছর আগে একই নির্বাচনে পাওয়া ভোটের অর্ধেকেরও কম এটি। আর গত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে জার্মানির শাসনক্ষমতার অন্য প্রধান অংশীদার, মধ্য-বামপন্থী এসপিডি, কোনওক্রমে পেয়েছে ৯.৩ শতাংশ। অন্তত এটুকু বলাই যায়, রাজনৈতিক মধ্যভূমি নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি।

এএফডি সরকার গড়তে পারবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পূর্ব জার্মানির এই রাজ্যে দলটির শাখাকে দেশের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘নিশ্চিত দক্ষিণপন্থী চরমপন্থী’ বলে চিহ্নিত করেছে। ৮৩ সদস্যের প্রাদেশিক আইনসভায় তাদের আসন ৩৯টি—একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সামান্য কম।

কিন্তু কোনও প্রাদেশিক নির্বাচনে এটিই এএফডির সর্বকালের সেরা ফল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির কোনও রাজ্যের শাসনক্ষমতা দখলের এত কাছাকাছি আর কোনও অতি দক্ষিণপন্থী দল পৌঁছয়নি। এই ফল গোটা ইউরোপে প্রবল আলোড়ন তুলেছে। জাতীয়তাবাদীরা উল্লাস করে একে ‘ঐতিহাসিক জয়’ বলছেন, দাবি করছেন, ‘এ তো সবে শুরু’। অন্য দিকে, মূলধারার নেতারা সতর্ক করে বলছেন, ইউরোপ এক ‘গভীর উদ্বেগজনক মুহূর্তে’ এসে দাঁড়িয়েছে।

আগামী সপ্তাহান্তে সুইডেনে সংসদীয় নির্বাচন। আগামী বসন্তে ফ্রান্সে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বছরের পরের দিকে ফ্রান্সের পাশাপাশি ইতালি, স্পেন ও পোল্যান্ডেও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। এই সব দেশেই জনমত সমীক্ষায় অতি দক্ষিণপন্থী দলগুলির অবস্থান শক্তিশালী। ইউরোপের মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শিবির তাই মহাদেশজুড়ে জাতীয়তাবাদী ঢেউয়ের আশঙ্কা করছে।

তবে জার্মানির বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি রাজ্যের একটি নির্বাচনের ফল থেকে অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত না টানাই বুদ্ধিমানের কাজ। বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, স্যাক্সনি-আনহাল্টে ভোটার সাকুল্যে প্রায় ১৮ লক্ষ। দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যটি অতি দক্ষিণপন্থীদের শক্ত ঘাঁটি। গত এক দশকের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনগুলিতে সেখানে এএফডির সমর্থন ধারাবাহিক ভাবে জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ থেকেছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোপীয় রাজনীতির অধ্যাপক তারিক আবু-চাদি বলেন, “জার্মানির কোনও আঞ্চলিক নির্বাচনে একটি অতি দক্ষিণপন্থী দলের জয়, ফ্রান্স, ব্রিটেন বা নেদারল্যান্ডসে একই ধরনের দলের আঞ্চলিক নির্বাচনে জেতার চেয়ে বেশি আতঙ্কজনক নয়। এএফডির ভোটভিত্তির সামাজিক চরিত্র সম্পর্কে ঢালাও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর ভিত্তি হওয়া উচিত নয় স্যাক্সনি-আনহাল্ট।”

তা সত্ত্বেও, জাতীয় জনমত সমীক্ষায় এএফডিই এগিয়ে রয়েছে। চলতি মাসের পরের দিকে যে মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়া রাজ্যে নির্বাচন হবে, সেখানেও তারা এগিয়ে—যদিও সেখানে এসপিডির সঙ্গে লড়াই অনেক বেশি হাড্ডাহাড্ডি। এমনকি উদারপন্থী বার্লিনেও দলটি দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এএফডির এই উত্থান ইউরোপজুড়ে অতি দক্ষিণপন্থী দলগুলির এক দশকব্যাপী অগ্রযাত্রারই অংশ।

আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাতেইস রোডাউনের নেতৃত্বে হওয়া গবেষণা অনুযায়ী, ইউরোপে এখন প্রায় প্রতি চার জন ভোটারের এক জন অতি দক্ষিণপন্থী দলকে ভোট দেন। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে এই অনুপাত প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। গত তিন বছরে বৃদ্ধির গতি বিশেষ ভাবে তীব্র হয়েছে।

৩১টি দেশের দেড়শোরও বেশি রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর এই বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, নিজ নিজ দেশের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে অতি দক্ষিণপন্থী দলকে ভোট দেওয়া ইউরোপীয়দের অনুপাত ২০২৬ সালে ২৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এক দশক আগে তা ছিল প্রায় ১০ শতাংশ; ১৯৯৫ সালে প্রায় ৫ শতাংশ।

অতি দক্ষিণপন্থী জনতুষ্টিবাদী দলগুলি এখন ক্রোয়েশিয়া, চেকিয়া, ইতালি ও ফিনল্যান্ডে শাসক জোটের অংশ। সুইডেনে তারা একটি দক্ষিণপন্থী সংখ্যালঘু সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে। অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও জার্মানিতে জনমত সমীক্ষায় এগিয়ে রয়েছে এই ধরনের দল। অতি সম্প্রতি পর্যন্ত ব্রিটেনেও একই চিত্র ছিল।

অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে তাদের পরাজয়ও হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে গত বছর গির্ট ভিল্ডার্সের ফ্রিডম পার্টি বা পিভিভি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসন হারিয়ে দ্বিতীয় স্থানে নেমে যায়। আর হাঙ্গেরিতে এপ্রিলে ভিক্টর অরবানের ফিদেস দল তার মধ্য-দক্ষিণপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে।