রাজ্যে অতি দক্ষিণপন্থীদের বিপুল জয়, তবু পদ ছাড়বেন না জার্মান চ্যান্সেলর মের্ৎস

যা জানা জরুরি
- রাজ্যের নির্বাচনে অতি দক্ষিণপন্থীদের বিপুল জয়ে তিনি ‘স্তম্ভিত’।
- কিন্তু পদ ছাড়বেন না বলে জানিয়ে দিলেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস।
- ওই নির্বাচনী সাফল্য অভিবাসনবিরোধী, ক্রেমলিনপন্থী রাজনীতিকদের ক্ষমতার একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
রাজ্যের নির্বাচনে অতি দক্ষিণপন্থীদের বিপুল জয়ে তিনি ‘স্তম্ভিত’। ধাক্কা খেয়ে সুরও অনেকটা নরম। কিন্তু পদ ছাড়বেন না বলে জানিয়ে দিলেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। ওই নির্বাচনী সাফল্য অভিবাসনবিরোধী, ক্রেমলিনপন্থী রাজনীতিকদের ক্ষমতার একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।
সোমবার বার্লিনে সাংবাদিকদের সামনে মের্ৎসকে বিবর্ণ দেখাচ্ছিল। তিনি বলেন, স্যাক্সনি-আনহাল্টে অলটারনেটিভ ফ্যুর ডয়চল্যান্ড বা এএফডির বিপুল জয় তাঁর রক্ষণশীল দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন বা সিডিইউয়ের ‘ভিত পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়েছে’।
দেশজুড়ে এএফডির সমর্থন অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মের্ৎস। অথচ নিজের জনপ্রিয়তা যখন তলানিতে, তখন তাঁকে দেখতে হচ্ছে একের পর এক নির্বাচনে অভিবাসনবিরোধী দলটির উত্থান। রবিবার পূর্ব জার্মানির এই রাজ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে সিডিইউকে তারা যেভাবে পর্যুদস্ত করেছে, আগের কোনও সাফল্যই তার সমতুল্য নয়।
এএফডি এবং তাদের প্রার্থী উলরিখ জিগমুন্ড নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি। তা সত্ত্বেও নাৎসি জমানার পরে জার্মানিতে প্রথম অতি দক্ষিণপন্থী রাজ্য সরকার গড়ার সম্ভাবনা তাঁদের সামনে খুলে গিয়েছে।
মের্ৎসের কথায় অনুতাপের সুর ছিল। ভোটারদের সঙ্গে নিজের ‘যোগাযোগ’ উন্নত করতেও তিনি প্রস্তুত বলে জানান। তাঁর বক্তব্য, ‘বহু বছরের মধ্যে, কয়েক দশকের মধ্যে, এটাই সিডিইউয়ের সবচেয়ে খারাপ নির্বাচনী পরাজয়। অবশ্যই এর পরিণতি থাকতে হবে।’
বুথফেরত সমীক্ষায় ইঙ্গিত মিলেছে, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি গভীর অসন্তোষ এবং ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি পরিচালনায় তার ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, মের্ৎসের কাজকর্মে সন্তুষ্ট মাত্র ৯ শতাংশ মানুষ।
একসময়ে সুগন্ধি বিক্রি করতেন জিগমুন্ড। সংবাদমাধ্যমকে কাজে লাগাতে দক্ষ এই নেতা পূর্বতন কমিউনিস্টশাসিত পূর্ব জার্মানির মানুষের বঞ্চনাবোধকেও নিজের পক্ষে টেনেছেন। বার্লিন প্রাচীর পতনের তিন দশকেরও বেশি সময় পরেও সেখানকার মানুষের মধ্যে অভিযোগ প্রবল—তাঁদের সঙ্গে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’-এর মতো আচরণ করা হয়।
৩৫ বছরের জিগমুন্ড ৭০ বছরের মের্ৎসকে বিদ্রুপ করে বলেছেন, তিনি এএফডির জন্য ‘খুব ভাল প্রচারক’।
ক্ষমতায় আসার মাত্র ১৬ মাসের মাথায় মের্ৎস মেনে নিয়েছেন, তাঁর নিজের কম জনপ্রিয়তাও দলের পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, ‘আমি জানি, এই নির্বাচনের প্রচারে বারবার ব্যক্তিগত ভাবে আমার প্রসঙ্গ উঠেছে। মানুষের যাবতীয় আবেগকে বুঝে তাঁদের কাছে আরও কার্যকর ভাবে পৌঁছনোর চেষ্টা করতে হবে আমাদের—আমাকেও।’
সিডিইউয়ের জোট সরকারের ছোট শরিক সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা বিধিবদ্ধ স্বাস্থ্যসেবা ও পেনশন ব্যবস্থার ভিত মজবুত করতে প্রস্তাবিত বিতর্কিত পদক্ষেপগুলি কিছুটা লঘু করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
কিন্তু মের্ৎস বলেছেন, ‘সংস্কারের পথে এগিয়ে চলার সংকল্পে আমি অটল।’ তাঁর যুক্তি, ‘আমাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের’ স্বার্থেই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তিনি আরও বলেন, ‘হাল ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই আমার কাছে নেই।’
জার্মানির মিত্র দেশগুলিকে মের্ৎস আশ্বস্ত করতে চান যে, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলি চাপ সামলাতে সক্ষম এবং স্থিতিশীল’। দেশের বিপন্ন সংখ্যালঘুদের উদ্দেশেও তাঁর আশ্বাস, স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডি ক্ষমতায় এলেও জার্মানি নিজের মূল্যবোধ ও সংবিধান মেনে চলবে। তাঁর কথায়, ‘আমরা জানি, ইতিহাসের কারণে জার্মানির বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।’
ইউক্রেনের প্রশ্নেও অবস্থান বদলাবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মের্ৎস। তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার বিরুদ্ধেও আমাদের স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হবে—এই মৌলিক বিশ্বাস থেকে আমি এক মিলিমিটারও সরব না।’
মের্ৎসের বক্তব্য, স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির সাফল্যে মস্কো উল্লসিত হবে। অতি দক্ষিণপন্থীদের নির্বাচনী প্রচারে রাশিয়া সাহায্য করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। রুশ হস্তক্ষেপ ও নাশকতার অভিযোগের মধ্যেই চলতি মাসে জার্মানির আরও দু’টি রাজ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা।
সিডিইউ তাদের চ্যান্সেলর তথা দলীয় নেতার পাশে দাঁড়ালেও কয়েক জন প্রভাবশালী ভাষ্যকার প্রকাশ্যেই তাঁকে অবিলম্বে সরানোর দাবি জানিয়েছেন। যদিও জার্মানির আইন অনুযায়ী তা করা জটিল।
ডের স্পিগেলের প্রধান সম্পাদক ডির্ক কুর্বজুভাইট বলেছেন, জার্মানির প্রয়োজন ‘সবকিছু নতুন করে শুরু করা, এবং তার সূচনা হতে হবে ফ্রিডরিখ মের্ৎসকে দিয়েই’। তাঁর মন্তব্য, ‘স্পষ্টতই এই সময়ে এই পদের জন্য তিনি ভুল মানুষ।’
জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এএফডির স্যাক্সনি-আনহাল্ট শাখাকে ‘নিশ্চিত ভাবে দক্ষিণপন্থী উগ্রবাদী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। দলটি যেসব অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীকে অবাঞ্ছিত মনে করে, তাঁদের ব্যাপক হারে বহিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, তা হবে বেআইনি। পাশাপাশি সামাজিক কল্যাণে বিপুল ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা, যদিও সেই অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা স্পষ্ট নয়।
যেসব সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে এএফডি ‘দেশপ্রেমহীন’ বলে মনে করে, সেগুলির সরকারি সহায়তাও দলের নিশানায়। এতে ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জিগমুন্ডকে রাজ্যের সরকারপ্রধান নির্বাচিত করার মতো আসন এএফডি পায়নি। কিন্তু দলের নেতারা জানিয়েছেন, অন্য দলের বিদ্রোহী বিধায়কদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবেন তাঁরা—যাঁরা সরকার গড়ার নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে রাজি হবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে এএফডি মাত্র তিনটি আসন দূরে।
রক্ষণশীল ও বামপন্থী জনতুষ্টিবাদী অবস্থানের মিশেলে গড়ে ওঠা বিএসডব্লিউ দল এএফডির সঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। এই দলও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং অভিবাসন বহুলাংশে বন্ধ করার পক্ষে। তবে নির্বাচনের আগে তারা রাজ্য সরকারে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা খারিজ করেছিল।
এএফডি প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ১৩ বছর মূলধারার দলগুলি অতি দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক ‘অগ্নিপ্রাচীর’ বজায় রেখেছে। এএফডিকে ক্ষমতায় পৌঁছে দিতে পারে, এমন কোনও আনুষ্ঠানিক সহযোগিতায় তারা রাজি হয়নি। কিন্তু দলটিকে একঘরে করার এই কৌশল উল্টো ফল দিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। চিরস্থায়ী ‘বহিরাগত’ হিসেবে এএফডির অবস্থান প্রচলিত রাজনীতিতে বিরক্ত বিপুলসংখ্যক ভোটারকে আকৃষ্ট করছে।
স্যাক্সনি-আনহাল্টের সিডিইউ সরকারপ্রধান স্ভেন শুলৎসে স্বীকার করেছেন, মাত্র ১৭ শতাংশ ভোট পাওয়ার এই লজ্জাজনক ফলের পরে রাজ্য শাসনের ‘কোনও জনাদেশ’ তাঁর দলের নেই। বিধানসভার বাকি সব দলকে নিয়ে কোনও রকমে একটি জটিল জোট গড়ে তোলা সম্ভব হলেও এই বাস্তবতা বদলাবে না।
তুলনামূলক ভাবে দরিদ্র, পূর্বতন কমিউনিস্টশাসিত অঞ্চল হিসেবে স্যাক্সনি-আনহাল্ট এএফডির শক্ত ঘাঁটিগুলির একটি। তবে ইস্পাত, রাসায়নিক ও গাড়ি শিল্পে উদ্বেগজনক অবনতির লক্ষণের মধ্যে পশ্চিম জার্মানিতেও দলটি প্রভাব বাড়াতে শুরু করেছে।
২০ সেপ্টেম্বর জার্মানির আরও দু’টি অঞ্চলে নির্বাচন—বার্লিন এবং পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেকলেনবুর্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়ায়। দ্বিতীয় রাজ্যটিতেও এএফডি শক্তিশালী।
রবিবারের ফলের পরে উচ্ছ্বসিত দলের সহনেত্রী অ্যালিস ভাইডেল জানিয়েছেন, তাঁদের পরবর্তী লক্ষ্য ২০২৯ সালে নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচনে ৪০ শতাংশ ভোট পাওয়া। বর্তমানে জনমত সমীক্ষায় এএফডির সমর্থন প্রায় ২৮ শতাংশ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



