হাইলাইটস:

  • ২৪ জুলাই শেষ হচ্ছে ভারতের অধিকাংশ পণ্যের উপর আমেরিকার অস্থায়ী ১০% আমদানি শুল্কের মেয়াদ।
  • এই শুল্ক শুধু ভারতের নয়, আমেরিকার অধিকাংশ বাণিজ্যিক অংশীদারের ক্ষেত্রেই একইভাবে কার্যকর ছিল।
  • ভারতের বিরুদ্ধে চলা দুটি পৃথক মার্কিন তদন্ত ভবিষ্যতে নতুন শুল্ক আরোপের ভিত্তি হতে পারে।
  • ভারত-আমেরিকার অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হলেও এখনও স্বাক্ষর হয়নি।
  • রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখলে ভারতের বিরুদ্ধে ১০০% পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্কের প্রস্তাবও মার্কিন কংগ্রেসে আলোচনায় রয়েছে।
  • ফলে ২৪ জুলাইয়ের পর পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত ও চলমান বাণিজ্য আলোচনার ওপর।

বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের রফতানিকারকদের জন্য ২৪ জুলাই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। কারণ ওই দিনই শেষ হচ্ছে আমেরিকায় ভারতীয় অধিকাংশ পণ্যের উপর কার্যকর থাকা অস্থায়ী ১০ শতাংশ আমদানি শুল্কের মেয়াদ। তবে শুল্ক উঠে যাবে, না কি তার জায়গায় নতুন কোনও ব্যবস্থা আসবে— সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।

এই শুল্ক কোনও স্থায়ী বাণিজ্যনীতি ছিল না। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের শুল্কনীতির আইনি ভিত্তি বাতিল করে দেওয়ার পর অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে এই ১০ শতাংশ শুল্ক চালু করা হয়েছিল। আইন অনুযায়ী এর মেয়াদ সীমিত ছিল এবং ২৪ জুলাই তা শেষ হচ্ছে।

কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়া মানেই যে শুল্ক উঠে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ একই সময়ে ভারতের বিরুদ্ধে আমেরিকায় দুটি পৃথক বাণিজ্য তদন্ত চলছে। এছাড়া ভারত ও আমেরিকার মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে, যা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

কেন চালু হয়েছিল ১০ শতাংশ শুল্ক?

সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের আগের শুল্কব্যবস্থার আইনি বৈধতা প্রশ্নের মুখে ফেলায় প্রশাসন দ্রুত একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সেই ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই অধিকাংশ আমদানির উপর ১০ শতাংশ হারে শুল্ক ধার্য করা হয়।

এটি কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ ছিল না। ভারতের পাশাপাশি আমেরিকার অধিকাংশ বাণিজ্যিক অংশীদারও একই শুল্কের আওতায় ছিল। ফলে ২৪ জুলাইয়ের সময়সীমা শুধু নয়াদিল্লির জন্য নয়, বিশ্বের বহু দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের বিরুদ্ধে কোন তদন্ত চলছে?

ওয়াশিংটনের হাতে বর্তমানে ভারতের বিরুদ্ধে দুটি পৃথক বাণিজ্য তদন্ত রয়েছে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নতুন শুল্ক আরোপ বা বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপের পথ খুলতে পারে।

এই তদন্তগুলির অন্যতম লক্ষ্য হল ভারতের কিছু নীতি বা বাণিজ্যিক ব্যবস্থার ফলে মার্কিন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না, তা নির্ধারণ করা। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভবিষ্যতের শুল্কব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

গত কয়েক মাস ধরে ভারত ও আমেরিকা একটি সীমিত বা অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। দুই পক্ষই একাধিক ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথা জানিয়েছে। কৃষি, শিল্পপণ্য, ডিজিটাল বাণিজ্য এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

যদি এই চুক্তি দ্রুত স্বাক্ষরিত হয়, তাহলে ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্কের পরিবর্তে নতুন, অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল বাণিজ্য কাঠামো তৈরি হতে পারে। এতে ভারতীয় রফতানিকারকদের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমবে।

তবে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। ফলে ২৪ জুলাইয়ের আগে চুক্তি কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে নতুন ঝুঁকি

ভারতের সামনে আরও একটি বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে মার্কিন কংগ্রেসে আলোচনাধীন একটি বিল।

প্রস্তাবিত এই আইনে এমন দেশগুলির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে, যারা রাশিয়ার কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তেল কিনছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর ভারত রাশিয়া থেকে কম দামে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। ভারতের যুক্তি, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন না করেই এই কেনাকাটা হচ্ছে।

কিন্তু ওয়াশিংটনের একাংশ এই অবস্থান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। ফলে বাণিজ্য আলোচনার বাইরে থেকেও নতুন শুল্কের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ভারতের কোন খাত সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হতে পারে?

যদি নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে ভারতের শ্রমঘন রফতানি শিল্পে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • বস্ত্র ও পোশাক
  • চামড়াজাত পণ্য
  • রত্ন ও গয়না
  • প্রকৌশল পণ্য
  • রাসায়নিক দ্রব্য
  • অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ
  • কৃষিভিত্তিক কিছু রফতানি

আমেরিকা ভারতের অন্যতম বৃহৎ রফতানি বাজার। ফলে অতিরিক্ত শুল্ক ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল করতে পারে এবং রফতানিকারকদের মুনাফায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ভারতের অবস্থান কী?

ভারত বরাবরই বলে এসেছে যে, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই বাণিজ্যিক বিরোধের সমাধান হওয়া উচিত। দুই দেশই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহী।

নয়াদিল্লির লক্ষ্য এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানো, যাতে বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ে, অপ্রয়োজনীয় শুল্ক কমে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল আরও শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে আমেরিকা চায় বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার, শুল্ক হ্রাস এবং কিছু নীতিগত পরিবর্তন।

২৪ জুলাইয়ের পর কী হতে পারে?

বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রথমত, অন্তর্বর্তী কোনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বর্তমান ব্যবস্থার মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ভারত-আমেরিকার অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তি দ্রুত কার্যকর হলে নতুন শুল্ক কাঠামো চালু হতে পারে।

তৃতীয়ত, চলমান তদন্তের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পণ্যের উপর নতুন শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।

চতুর্থত, রাশিয়ার তেল কেনা সংক্রান্ত মার্কিন আইন যদি এগোয় এবং প্রশাসন তা প্রয়োগ করে, তাহলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিত্তিতে ভারতের কিছু পণ্যের উপর আরও কঠোর শুল্ক আরোপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সামনের বার্তা

২৪ জুলাই কোনও চূড়ান্ত সমাধানের দিন নয়; বরং ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। অস্থায়ী ১০ শতাংশ শুল্কের অবসান অনিশ্চয়তা কমাবে, না কি আরও জটিল পরিস্থিতির জন্ম দেবে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি সমান্তরাল প্রক্রিয়ার উপর—চলমান বাণিজ্যচুক্তি, মার্কিন তদন্তের ফলাফল এবং রাশিয়া-সংক্রান্ত ভূরাজনৈতিক অবস্থানের ওপর।

ভারতের রফতানিকারকদের কাছে তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ওয়াশিংটনের পরবর্তী ঘোষণা। কারণ ২৪ জুলাইয়ের পর শুধু একটি শুল্কের মেয়াদই শেষ হচ্ছে না, ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।