বাংলাস্ফিয়ার: সংসদ অভিযানের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হওয়া এক আন্দোলনকারী অস্ত্রোপচারের পর প্রথমবারের মতো নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ)-এর এক জওয়ান খুব কাছ থেকে তাঁর দিকে গুলি চালান এবং সেই গুলির পেলেট মুখে ও চোখের আশপাশে এসে লাগে। আহত অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং দীর্ঘ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মুখ থেকে একাধিক পেলেট বের করা হয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারী সংগঠন, বিরোধী দল এবং মানবাধিকার কর্মীরা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে দিল্লি পুলিশ দাবি করেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

আহত যুবকের বক্তব্য অনুযায়ী, সংসদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ প্রথমে ব্যারিকেড দিয়ে মিছিল আটকায়। আন্দোলনকারীরা সেখানে বসে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করলে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। সেই সময় হঠাৎ করেই নিরাপত্তারক্ষীরা বলপ্রয়োগ করেন। তাঁর দাবি, তিনি সামনের সারিতে ছিলেন না, তবুও আচমকা মুখে তীব্র আঘাত অনুভব করেন। পরে জানতে পারেন, পেলেট তাঁর মুখে ঢুকে গেছে।

তিনি বলেন, “একজন আরএএফ জওয়ান আমার দিকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। মুহূর্তের মধ্যে মুখ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল। চারদিকে রক্ত পড়ছিল। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।”

চিকিৎসকদের কথায়, তাঁর মুখে ও চোখের চারপাশে একাধিক ধাতব কণা আটকে গিয়েছিল। জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করে সেগুলি বের করতে হয়। বর্তমানে তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল হলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে। চিকিৎসকদের মতে, সামান্য এদিক-ওদিক হলে চোখের স্থায়ী ক্ষতি পর্যন্ত হতে পারত।

আন্দোলনকারীর পরিবার জানিয়েছে, প্রথম দিকে তাঁর সঙ্গে কথা বলাও সম্ভব হচ্ছিল না। অস্ত্রোপচারের পর ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হওয়ায় তিনি ঘটনার বিবরণ দিতে সক্ষম হন। পরিবারের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একজন ছাত্রের ওপর এ ধরনের বলপ্রয়োগ কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আন্দোলনের নেতৃত্বও এই ঘটনাকে সামনে এনে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, নিরস্ত্র ছাত্র-যুবকদের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস এবং পেলেট ব্যবহার করে পরিস্থিতিকে অযথা উত্তপ্ত করা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার পাশাপাশি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে। তাদের বক্তব্য, গণতান্ত্রিক দেশে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। সেই অধিকারের চর্চা করতে গিয়ে আন্দোলনকারীদের রক্তাক্ত হতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংসদেও এই ইস্যুতে সরকারকে ঘিরে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে বিরোধীরা।

অন্যদিকে দিল্লি পুলিশের বক্তব্য, সংসদের দিকে অনুমতি ছাড়া মিছিল এগিয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের একাংশ ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন এবং নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। সেই পরিস্থিতিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশের দাবি, বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ধাক্কাধাক্কি ও উসকানিমূলক আচরণ করা হয়েছিল।

তবে আহত যুবকের অভিযোগ এবং পুলিশের ব্যাখ্যার মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। ঠিক কী ধরনের অস্ত্র বা ভিড় নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, যদি সত্যিই পেলেট ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তবে তার প্রয়োজনীয়তা ও বৈধতা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।

এই ঘটনাটি এমন এক সময় সামনে এল, যখন শিক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়ম, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং আন্দোলনকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক চলছে। আন্দোলনের অন্যতম মুখ সোনম ওয়াংচুকের অনশন, ছাত্রদের বিক্ষোভ এবং বিরোধীদের লাগাতার চাপের মধ্যে আহত আন্দোলনকারীর এই অভিযোগ নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়েছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহত যুবকের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চলছে। মুখের ক্ষত সেরে উঠতে এবং দৃষ্টিশক্তির উপর কোনও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও কিছুদিন চিকিৎসার প্রয়োজন হবে। তিনি আপাতত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও তাঁর বক্তব্য ইতিমধ্যেই আন্দোলন এবং রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

এদিকে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলি ঘটনার বিচারবিভাগীয় তদন্ত, দায়ী নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং আহতদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছে। সরকারের তরফে এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে পৃথক কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে এই ঘটনাকে ঘিরে পুলিশের ভূমিকা, প্রতিবাদ দমনের কৌশল এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।