হাইলাইটস
- পহেলগাম হামলার পর কাশ্মীর উপত্যকায় প্রথম বড় জঙ্গি হামলা।
- অমরনাথ যাত্রার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক পুলিশকর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় জঙ্গিরা।
- ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চ সতর্কতা, হামলাকারীদের খুঁজতে ব্যাপক তল্লাশি শুরু।
- যাত্রাপথের নিরাপত্তা আরও জোরদার করার নির্দেশ প্রশাসনের।
বাংলাস্ফিয়ার: পহেলগামে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার কয়েক মাস পর ফের রক্তাক্ত হল কাশ্মীর উপত্যকা। অমরনাথ যাত্রার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক পুলিশকর্মীকে গুলি করে হত্যা করেছে জঙ্গিরা। এই ঘটনাকে চলতি বছরের অমরনাথ যাত্রাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে পহেলগাম হামলার পর উপত্যকায় এটি প্রথম বড় জঙ্গি হামলা বলেও মনে করা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, নিহত পুলিশকর্মী অমরনাথ যাত্রার নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হিসেবে মোতায়েন ছিলেন। ডিউটির সময় আচমকাই সশস্ত্র জঙ্গিরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুরুতর জখম অবস্থায় তাঁকে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
হামলার পর গোটা এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা অভিযান শুরু হয়েছে। সেনা, জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ, কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (সিআরপিএফ) এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার যৌথ বাহিনী হামলাকারীদের খুঁজে বের করতে এলাকাজুড়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা, বনাঞ্চল এবং সম্ভাব্য পালানোর পথ ঘিরে ফেলা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হচ্ছে, অমরনাথ যাত্রাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বাহিনীর উপর চাপ সৃষ্টি করাই ছিল জঙ্গিদের উদ্দেশ্য। সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীরে জঙ্গি কার্যকলাপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এলেও বিচ্ছিন্ন হামলার মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করার কৌশল নিয়েছে জঙ্গি সংগঠনগুলি। এই হামলাও সেই পরিকল্পনার অংশ হতে পারে বলে তদন্তকারীদের অনুমান।
অমরনাথ যাত্রা ভারতের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় তীর্থযাত্রা। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী কাশ্মীরের দুর্গম পাহাড়ি পথে গুহামন্দিরে দর্শনের জন্য যান। যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। সেনা, সিআরপিএফ, বিএসএফ, আইটিবিপি এবং জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের হাজার হাজার সদস্য মোতায়েন থাকেন। উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা, ড্রোন, সিসিটিভি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত এলাকা স্যানিটাইজেশনের ব্যবস্থাও থাকে।
এই কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেও এক পুলিশকর্মীকে লক্ষ্য করে হামলা হওয়ায় নতুন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জঙ্গিরা বড় ধরনের হামলার বদলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ছোট কিন্তু প্রতীকী আক্রমণের পথ বেছে নিচ্ছে, যাতে উপত্যকায় অস্থিরতার বার্তা দেওয়া যায়।
পহেলগামে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার পর থেকেই গোটা কাশ্মীরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহুগুণ বাড়ানো হয়েছিল। বিশেষ করে অমরনাথ যাত্রার রুটে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়, সংবেদনশীল এলাকায় নিয়মিত তল্লাশি অভিযান চালানো হয় এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়। তবুও এই হামলা প্রমাণ করল, জঙ্গি নেটওয়ার্ক পুরোপুরি নির্মূল করা এখনও সম্ভব হয়নি।
হামলার পর নিরাপত্তা সংস্থাগুলি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে আরও জোর দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সক্রিয় জঙ্গিদের গতিবিধি, স্থানীয় সহযোগী চক্র এবং সীমান্তপারের মদত নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। হামলার সঙ্গে কোনও নির্দিষ্ট জঙ্গি সংগঠনের যোগ রয়েছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, অমরনাথ যাত্রা নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী চলবে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যাত্রাপথে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন, যানবাহনের কড়া তল্লাশি, সন্দেহভাজনদের উপর নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নিহত পুলিশকর্মীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী। তাঁর আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদ দমনে বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার হবে এবং হামলাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
এই হামলা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন উপত্যকায় পর্যটন, তীর্থযাত্রা এবং স্বাভাবিক জনজীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তাই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, জঙ্গিদের উদ্দেশ্য শুধু প্রাণহানি ঘটানো নয়, বরং কাশ্মীরে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরানোর প্রচেষ্টাকেও ধাক্কা দেওয়া। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, এই ধরনের বিচ্ছিন্ন হামলায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান থেমে থাকবে না; বরং আরও আক্রমণাত্মক কৌশলে জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার অভিযান চালানো হবে।