হাইলাইটস

  • টানা ভারী বৃষ্টিতে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত।
  • দার্জিলিং জেলায় একটি সেতু ভেঙে পড়ার ঘটনায় এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর।
  • পাহাড়ে ধস, রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক বিঘ্ন।
  • কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার বহু রাস্তা জলমগ্ন, ভোগান্তিতে নিত্যযাত্রীরা।
  • আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় আরও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা।

বাংলাস্ফিয়ার: বর্ষা এ বছর বাংলায় যেন আগেভাগেই নিজের শক্তির পরিচয় দিতে শুরু করেছে। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ— রাজ্যের বিস্তীর্ণ অংশ কার্যত জল ও কাদার সঙ্গে লড়াই করছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে দার্জিলিং জেলায়, যেখানে প্রবল বর্ষণের জেরে একটি সেতু ভেঙে পড়ে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় জল জমে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বহু রাস্তা। শহরের নানা অংশে যানজট, গণপরিবহণের বিলম্ব এবং নাগরিক দুর্ভোগ আবারও সামনে এনে দিয়েছে নগর পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতাকে।

দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি এলাকায় বর্ষার বৃষ্টি সবসময়ই উদ্বেগের কারণ। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রবল বর্ষণের ফলে পাহাড়ি ঝোরা ও নদীগুলিতে জলস্তর দ্রুত বেড়ে যায়। তার জেরেই একটি সেতুর একটি অংশ ভেঙে পড়ে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনাস্থলে থাকা এক ব্যক্তি সেতু ভাঙার সময় নিচে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারান। দুর্ঘটনার পর প্রশাসন দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করে। পুলিশ, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন।

শুধু সেতু ভাঙাই নয়, দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলার একাধিক এলাকায় ছোট-বড় ধসের খবর মিলেছে। পাহাড়ি রাস্তায় কাদা ও পাথর নেমে আসায় যান চলাচল বারবার বন্ধ করতে হয়েছে। পর্যটকদেরও সতর্ক করা হয়েছে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার জন্য। প্রশাসনের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জেলাতেও বৃষ্টির প্রভাব স্পষ্ট। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারের বিভিন্ন এলাকায় নদীগুলির জলস্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষিজমিতে জল জমে যাওয়ায় চাষিরা উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে আমন ধানের প্রস্তুতির সময় অতিরিক্ত জল অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

দক্ষিণবঙ্গে পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দু অবশ্য কলকাতা। শনিবার ভোর থেকে মাঝেমধ্যেই ভারী বৃষ্টি হয়েছে। শহরের বহু গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু সমান জল জমে যায়। অফিসপাড়া, বাজার এলাকা এবং আবাসিক মহল্লা— সর্বত্রই একই ছবি। কোথাও কোথাও নিকাশি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে কয়েক ঘণ্টা পরেও জল নামেনি।

কলকাতার পূর্ব, মধ্য এবং দক্ষিণাংশের বেশ কয়েকটি এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। বাস ও ট্যাক্সির গতি কমে যায়। বহু জায়গায় ব্যক্তিগত গাড়িও জল জমার কারণে আটকে পড়ে। মেট্রো পরিষেবা স্বাভাবিক থাকলেও স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছতে যাত্রীদের ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে। স্কুল-কলেজে উপস্থিতির হারও তুলনামূলকভাবে কম ছিল বলে জানা গিয়েছে।

শহরতলির পরিস্থিতিও খুব একটা আলাদা নয়। হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হুগলি এবং নদিয়ার বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও বাড়ির ভিতরেও জল ঢুকে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন পাম্প বসিয়ে জল নামানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু অব্যাহত বৃষ্টির ফলে সেই কাজ সহজ হচ্ছে না।

আবহাওয়াবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগরের উপর তৈরি হওয়া একটি নিম্নচাপজনিত পরিস্থিতি এবং সক্রিয় মৌসুমি অক্ষরেখার কারণে এই বৃষ্টির দাপট। সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প স্থলভাগে প্রবেশ করছে, যার ফলে মেঘের ঘনত্ব এবং বৃষ্টিপাত দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গে স্বল্প সময়ের মধ্যে অতিভারী বৃষ্টির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

আবহাওয়া দফতর ইতিমধ্যেই একাধিক জেলায় সতর্কতা জারি করেছে। পাহাড়ি এলাকায় ধস এবং সমতলে জল জমার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মৎস্যজীবীদেরও সমুদ্রে যেতে বারণ করা হয়েছে, কারণ উপকূলবর্তী এলাকায় আবহাওয়া আরও খারাপ হতে পারে।

প্রশাসন পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। জেলা প্রশাসনগুলিকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জলমগ্ন এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধার সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকায় বিদ্যুৎ দফতরকেও বিশেষ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।

তবে প্রতি বছরের মতো এ বারও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে— কেন সামান্য কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই কলকাতার এত বড় অংশ জলমগ্ন হয়ে পড়ে? বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরের পুরনো নিকাশি ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাধারের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত কংক্রিটের ব্যবহার এই সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। জল দ্রুত মাটির নিচে প্রবেশ করতে না পেরে রাস্তাতেই জমে থাকে। ফলে কয়েক ঘণ্টার প্রবল বর্ষণও নাগরিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।

বর্ষা বাংলার কৃষি, জলসম্পদ ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে এটি দুর্যোগেরও ঋতু। পাহাড়ে ধস, নদীর জলস্তর বৃদ্ধি, সেতু ও রাস্তার ক্ষতি, শহরে জলাবদ্ধতা— সব মিলিয়ে বর্ষা এক দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি করে। দার্জিলিঙের সেতু বিপর্যয় এবং কলকাতার জলমগ্ন চিত্র সেই বাস্তবতারই সাম্প্রতিক উদাহরণ।

আগামী কয়েক দিন আবহাওয়ার দিকে নজর থাকবে সবার। কারণ আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস বলছে, বৃষ্টির এই পর্ব এখনও শেষ হয়নি। বরং কোথাও কোথাও আরও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে প্রশাসনের প্রস্তুতি যেমন জরুরি, তেমনি সাধারণ মানুষের সতর্কতাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষার সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার বিপজ্জনক রূপও যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, শনিবারের বাংলা তার আরেকটি প্রমাণ দেখল।