বাংলাস্ফিয়ার: লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লার সঙ্গে গতকাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-অনুগত তৃণমূল সাংসদদের বৈঠক ছিল বর্তমান তৃণমূল সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলির একটি। কারণ এই বৈঠক শুধুমাত্র সাংসদদের বসার আসন নিয়ে ছিল না; এর কেন্দ্রে রয়েছে লোকসভায় “আসল তৃণমূল” কে, বিদ্রোহী সাংসদদের ভবিষ্যৎ কী হবে, এবং সংসদীয় রাজনীতিতে মমতা শিবির আদৌ কতটা প্রভাব ধরে রাখতে পারবে— সেই প্রশ্ন।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অভিষেক বন্দোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্র, কল্যাণ ব্যানার্জী এবং সৌগত রায়। তাঁরা স্পিকারের কাছে মূলত দুটি দাবি পেশ করেন। প্রথমত, বিদ্রোহী ২০ জন সাংসদের আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া। দ্বিতীয়ত, তাঁদের বিরুদ্ধে দলত্যাগবিরোধী আইনে অযোগ্যতার প্রক্রিয়া শুরু করা।

মমতা শিবিরের যুক্তি সহজ। তাঁদের বক্তব্য, যে সাংসদরা তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরা পরে অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারেন না। বিদ্রোহী সাংসদরা ইতিমধ্যে স্পিকারের কাছে গিয়ে আলাদা বসার ব্যবস্থা চেয়েছেন এবং এনডিএ-ঘনিষ্ঠ এনসিপিআই-এর সঙ্গে একীভূত হওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। তৃণমূলের দাবি, এই কাজই প্রমাণ করে তাঁরা স্বেচ্ছায় দলত্যাগ করেছেন। ফলে সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী তাঁদের সদস্যপদ খারিজ হওয়া উচিত।

কিন্তু এখানেই আইনি জটিলতা শুরু।

বিদ্রোহী সাংসদদের প্রধান ভরসা দশম তফসিলের ‘মার্জার’ বা একীভূতকরণ সংক্রান্ত বিধান। তাঁদের দাবি, লোকসভায় তৃণমূলের নির্বাচিত সাংসদদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি তাঁদের সঙ্গে রয়েছে। তাই তাঁরা দলভাঙা নন, বরং বৈধ একীভূতকরণের পথে হাঁটছেন। অন্যদিকে মমতা শিবির বলছে, দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ থাকলেই হবে না; মূল রাজনৈতিক দলও যদি না মেশে, তাহলে কেবল সংসদীয় দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়ে মার্জারের সুবিধা পাওয়া যায় না।

গতকালের বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকারের কাছে প্রায় ৬০০ পাতার নথি জমা দিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। সেখানে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা, সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায় এবং দলত্যাগবিরোধী আইনের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে।

প্রশ্ন হল, এর ফলে কি মমতা শিবিরের অভীষ্ট সিদ্ধ হবে?

সংক্ষিপ্ত উত্তর— অবিলম্বে নয়।

কারণ লোকসভার স্পিকার সাধারণত এ ধরনের বিষয়ে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেন না। ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে যে ওম বিড়লা উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে, আইনি মতামত নিয়ে, তারপর সিদ্ধান্ত নিতে চান। তাঁর দপ্তরও জানিয়েছে যে সব দিক বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

আরও বড় কথা, ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে দলত্যাগ সংক্রান্ত মামলাগুলি বহু সময় ধরে ঝুলে থাকার নজির রয়েছে। মহারাষ্ট্রের শিবসেনা ভাঙন, এনসিপি ভাঙন কিংবা কর্ণাটকের একাধিক রাজনৈতিক সংকট— সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে আইনি নিষ্পত্তি দীর্ঘ সময় নিয়েছে। ফলে তৃণমূলের আশা থাকলেও দ্রুত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বৈঠকটি ব্যর্থ।

বরং রাজনৈতিকভাবে মমতা শিবিরের জন্য এই বৈঠকের গুরুত্ব অনেক। কারণ তাঁরা স্পিকারের নথিভুক্ত রেকর্ডে নিজেদের আপত্তি জানিয়ে দিলেন। ভবিষ্যতে যদি স্পিকার বিদ্রোহীদের স্বীকৃতি দেন বা তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেন, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রেও এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে থাকবে।

আরেকটি দিকও উল্লেখযোগ্য। বিদ্রোহী সাংসদরা প্রথমে স্পিকারের কাছে গিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করেছিলেন। তার ফলে রাজনৈতিক বার্তা গিয়েছিল যে লোকসভায় তৃণমূলের বড় অংশই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। গতকালের বৈঠকের মাধ্যমে মমতা শিবির সেই বার্তার পাল্টা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তারা বোঝাতে চেয়েছে যে সাংগঠনিক তৃণমূল এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই দল এবং সংসদীয় সংখ্যার জোরে তার মালিকানা বদলে যায় না।

বাস্তবে এখন তিনটি সম্ভাবনা সামনে রয়েছে।

প্রথম সম্ভাবনা, স্পিকার বিদ্রোহীদের মার্জারের দাবি নাকচ করে দেন এবং অযোগ্যতা মামলার শুনানি শুরু করেন। সে ক্ষেত্রে মমতা শিবির বড় রাজনৈতিক জয় পাবে।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা, স্পিকার তাঁদের আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে কিছু সংসদীয় সুবিধা দেন কিন্তু অযোগ্যতার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত পিছিয়ে রাখেন। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে আপাতত এটাই সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ।

তৃতীয় সম্ভাবনা, স্পিকার মনে করেন যে বিদ্রোহীরা বৈধভাবে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন দেখাতে পেরেছেন এবং তাঁদের দাবিকে স্বীকৃতি দেন। সে ক্ষেত্রে মমতা শিবিরের জন্য তা বড় ধাক্কা হবে এবং বিষয়টি প্রায় নিশ্চিতভাবেই আদালতে যাবে।

সব মিলিয়ে, গতকালের বৈঠকে মমতাপন্থী সাংসদরা তাঁদের বক্তব্য স্পিকারের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন। এটি তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু এটিকে এখনও বিজয় বলা যাবে না। লোকসভার স্পিকার যদি বিদ্রোহী সাংসদদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেন, তবেই তাঁদের প্রকৃত লক্ষ্য পূরণ হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বলা যায়, মমতা শিবির লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাউন্ড জিতেছে, কিন্তু ম্যাচের ফল এখনও অনেক দূরে।