বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের বিদেশি অনুদান (নিয়ন্ত্রণ) আইন (এফসিআরএ) সংশোধনকে ঘিরে এবার আন্তর্জাতিক স্তরেও বিতর্ক শুরু হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্য রাইলি মুর অভিযোগ করেছেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে ভারত সরকার গির্জা ও খ্রিস্টান ধর্মীয় দাতব্য সংস্থাগুলির উপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেতে পারে। তাঁর দাবি, এই আইন বর্তমান আকারে পাশ হলে তা শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নই তুলবে না, ভারত–আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মুর সামাজিক মাধ্যমে এবং প্রকাশ্য বিবৃতিতে এই সংশোধনীকে “খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট আক্রমণ” বলে বর্ণনা করেন। তিনি ভারত সরকারকে বিলটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান এবং বলেন, ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিতর্কের কেন্দ্রে কী রয়েছে?
প্রস্তাবিত সংশোধনীর সবচেয়ে আলোচিত অংশ হল ‘ডিজাইনেটেড অথরিটি’ বা মনোনীত কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব। নতুন ব্যবস্থায় কোনও সংস্থার এফসিআরএ নিবন্ধন বাতিল হলে, নবীকরণ না হলে বা স্বেচ্ছায় নিবন্ধন ছেড়ে দিলে বিদেশি অনুদানে তৈরি সম্পদ ও অব্যবহৃত তহবিল প্রথমে এই কর্তৃপক্ষের অধীনে যাবে। পরে নিবন্ধন পুনরুদ্ধার না হলে সেই সম্পদের স্থায়ী ব্যবস্থাপনার ক্ষমতাও ওই কর্তৃপক্ষের হাতে থাকবে।
এই ব্যবস্থাকেই কেন্দ্র করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাইলি মুর। তাঁর আশঙ্কা, এর ফলে গির্জা ও ধর্মীয় দাতব্য সংস্থার সম্পত্তির উপর সরকারি হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ভারতের সরকারের অবস্থান
তবে ভারত সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সরকারের বক্তব্য, সংশোধনীর উদ্দেশ্য কোনও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া নয়; বরং বিদেশি অনুদানের ব্যবহারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা।
প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (পিআইবি)-র ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মনোনীত কর্তৃপক্ষ কেবল বিদেশি অনুদানে তৈরি সম্পদের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধান করবে। কোনও সংস্থা যদি পরে আবার এফসিআরএ নিবন্ধন ফিরে পায়, তাহলে তার সম্পদ ও অব্যবহৃত অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। এছাড়া উপাসনালয়ের ধর্মীয় চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টিও আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন বিষয়টি আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পাচ্ছে?
রাইলি মুর তাঁর বক্তব্যে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ভারতের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ইতিহাস প্রাচীন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সেন্ট থমাস প্রথম শতাব্দীতে মালাবার উপকূলে এসে খ্রিস্টধর্মের প্রচার শুরু করেছিলেন। সেই ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হওয়া উচিত নয়।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বর্তমানে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত সহযোগিতার উপর দাঁড়িয়ে থাকলেও, মানবাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন মাঝেমধ্যেই দুই দেশের আলোচনায় উঠে আসে। সেই প্রেক্ষাপটে মুরের এই মন্তব্য নতুন কূটনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সমালোচনা বনাম সরকারের যুক্তি
সমালোচকদের মতে, নতুন সংশোধনী বিদেশি অনুদাননির্ভর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, চার্চ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়াবে। তাঁদের আশঙ্কা, নিবন্ধন বাতিলের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ক্ষমতা অত্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যাবে।
অন্যদিকে কেন্দ্রের দাবি, ২০১০ সালের মূল আইনে সম্পদ হস্তান্তরের ধারণা থাকলেও তার জন্য স্পষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছিল না। নতুন সংশোধনী সেই আইনি শূন্যতাই পূরণ করছে এবং এর উদ্দেশ্য কেবল বিদেশি অনুদানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
কূটনৈতিক প্রভাব কতটা?
রাইলি মুরের মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এটি এখনও মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। ফলে অবিলম্বে ভারত–আমেরিকা সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেই কূটনৈতিক মহলের ধারণা। তবে মার্কিন কংগ্রেসের কিছু সদস্য যদি একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করতে থাকেন, তাহলে বিষয়টি ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় স্থান পেতে পারে।
সব মিলিয়ে, এফসিআরএ সংশোধনী নিয়ে বিতর্ক এখন শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ নীতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। বিদেশি অনুদান, ধর্মীয় স্বাধীনতা, নাগরিক সমাজের ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে এই বিল আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।