বাংলাস্ফিয়ার: প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো আবহাওয়া-ব্যবস্থার প্রভাবে আগামী বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বের আরও প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন বলে সতর্ক করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP)।
সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই নতুন সংকট ইতিমধ্যেই তীব্র খাদ্য-অনিরাপত্তায় ভোগা ৪৫টি দেশের ২২ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষের অবস্থাকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে। অর্থাৎ, বর্তমান সংখ্যার সঙ্গে আরও এক-পঞ্চমাংশ মানুষ যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং ইরান যুদ্ধের জেরে খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে বিশ্ব ইতিমধ্যেই খাদ্যসংকটের চাপে রয়েছে। তার উপর এল নিনোর প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
WFP-র বিশ্লেষণ বলছে, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল এবং দক্ষিণ আফ্রিকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যা কৃষি উৎপাদন ও কৃষকদের জীবিকায় বড় ধাক্কা দিতে পারে।
এ বছরের এল নিনোকে অন্তত গত ৭০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও “সুপার এল নিনো” শব্দটির কোনও সরকারি স্বীকৃতি নেই, তবু বহু আবহাওয়াবিদ এই ঘটনাকে সেই মাত্রার বলেই বর্ণনা করছেন।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হচ্ছে। চলতি বছর অথবা ২০২৭ সালে পৃথিবী রেকর্ড উষ্ণতম বছরের সাক্ষী হতে পারে বলেও আগেই সতর্ক করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা।
বেসরকারি বিশ্লেষক সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই এল নিনোর কারণে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল। তবে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে WFP-র এই প্রতিবেদনই প্রথম বিস্তৃত মূল্যায়ন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও দুর্যোগ-পূর্ব ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য অন্তত ৮ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ রেখেছে WFP। তবে সংস্থার মতে, এই উদ্যোগ সত্ত্বেও প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে, কারণ অনেক কৃষক একাধিক ফসলের মৌসুম পর্যন্ত খাদ্য মজুত ধরে রাখতে পারবেন না।
WFP-র জলবায়ু ও সহনশীলতা বিভাগের পরিচালক রিচার্ড চুলার্টন বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় মূল চাষের মৌসুম চলবে চলতি বছরের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত। কিন্তু প্রকৃত খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে তারও প্রায় নয় মাস পরে, অর্থাৎ ২০২৭-২৮ সালের খাদ্যাভাবের মৌসুমে।
সংস্থার খাদ্যনিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক জ্যঁ-মার্টিন বাউয়ার জানান, ২০২৫ সালের ভালো ফসলের কারণে কিছুটা সুরক্ষা মিলেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে খাদ্যের দামে ইতিমধ্যেই ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর সময় ৬ কোটি থেকে ১০ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়েছিলেন। তবে সে সময় আগাম প্রস্তুতির বর্তমান ব্যবস্থা ছিল না। তাই এবার এল নিনো আরও শক্তিশালী হলেও, আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করছে WFP।
তবে চুলার্টনের মতে, অর্থাভাবের কারণে বহু জায়গায় তথ্য সংগ্রহ ব্যাহত হওয়ায় সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
WFP-র এই সমীক্ষা শুধুমাত্র সেই ৪৫টি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যেখানে সংস্থাটি খাদ্যনিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে। ফলে এর বাইরেও অন্যান্য দেশে খাদ্যসংকট দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাউয়ারের মতে, বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। বিশেষ করে বড় খাদ্য-রপ্তানিকারক দেশগুলি যদি রপ্তানি সীমিত করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। তাঁর কথায়, “বৃহৎ রপ্তানিকারক দেশগুলি যদি খাদ্য রপ্তানি বন্ধ বা সীমিত করে, তাহলে আঞ্চলিক স্তরে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং খাদ্যপ্রাপ্তির সংকট আরও তীব্র হতে পারে।”
ইতিমধ্যেই ব্রিটেন ও ইউরোপের কৃষকেরা অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ ও কম বৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। খুচরো বিক্রেতারাও আগামী দিনে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।