Home পরিবেশ ও জলবায়ূ এল নিনো ফিরে এল: শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী আবহাওয়া-ঘটনার সতর্কবার্তা

এল নিনো ফিরে এল: শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী আবহাওয়া-ঘটনার সতর্কবার্তা

by Ankita Senapati
0 comments 7 views 5 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  • প্রশান্ত মহাসাগরে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়েছে এল নিনো।
  • মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা নোয়ার পূর্বাভাস, এটি ১৯৫০ সালের পর থেকে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলির একটি হতে পারে।
  • রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে বলেছেন “জলবায়ু নিয়ে জরুরি সতর্কবার্তা”।
  • ভারত, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বহু অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা ও খাদ্যসংকটের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
  • বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর প্রভাবে ২০২৭ সাল হতে পারে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর।

বাংলাস্ফিয়ার: মাসের পর মাস জল্পনার পর অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরে এল এল নিনো। মার্কিন আবহাওয়া ও সমুদ্র গবেষণা সংস্থা নোয়া (National Oceanic and Atmospheric Administration)  বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, নিরক্ষরেখার কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরের জলের অস্বাভাবিক উষ্ণতার ফলে এল নিনো গঠিত হয়েছে এবং বছরের শেষ দিকে তা ঐতিহাসিক মাত্রায় পৌঁছাতে পারে।

নোয়ার হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ শরৎ ও শীতকালে এই এল নিনো এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে যে ১৯৫০ সালের পর থেকে নথিবদ্ধ সবচেয়ে বড় এল নিনো ঘটনাগুলির মধ্যে এর স্থান হবে। এমন সম্ভাবনার হার ৬৩ শতাংশ।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই পরিস্থিতিকে “একটি জরুরি জলবায়ু সতর্কবার্তা” বলে বর্ণনা করেছেন।

এল নিনো কী?

এল নিনো হল প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের সমুদ্রজল স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ হয়ে ওঠার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। কিন্তু এর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরে সীমাবদ্ধ থাকে না। সমুদ্রের অতিরিক্ত তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, জেট স্ট্রিমের গতিপথ বদলে দেয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরন পাল্টে দেয়।

বিজ্ঞানী অ্যাবি ফ্রেজিয়ারের ভাষায়, “এল নিনো পৃথিবীর পৃষ্ঠে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত তাপ নিয়ে আসে, যা বিশ্বের বহু অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা উসকে দেয়।”

ভারতের জন্য কী বিপদ?

ভারত এল নিনোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করা দেশগুলির মধ্যে অন্যতম। বিজ্ঞানীদের মতে, এ বছর দেশে আরও তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে বর্ষার বৃষ্টিপাতের ধরনেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

ভারতের কৃষি এখনও অনেকাংশে বর্ষার উপর নির্ভরশীল। ফলে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিলে ধান, ভুট্টা ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে। খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ারও আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বের কোথায় কী প্রভাব পড়বে?

দক্ষিণ আমেরিকায় এল নিনোর প্রথম লক্ষণ বহু দশক আগে ধরা পড়েছিল। সেখানে সাধারণত অতিবৃষ্টি, বন্যা এবং অস্বাভাবিক গরম আবহাওয়া দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়ায় খরা, দাবানল এবং তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বেড়ে যায়। উত্তর-পূর্ব আফ্রিকায় বিজ্ঞানী মুহম্মদ আজহার এহসানের মতে, দীর্ঘ খরার পর হঠাৎ অতিবৃষ্টির মতো “আবহাওয়ার চরম দোলাচল” দেখা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের খরাপীড়িত অঞ্চলগুলিতে কিছুটা বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে বেশি ঝড়বৃষ্টি, পশ্চিম উপকূলে শৈবাল বৃদ্ধির প্রকোপ এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় তুলনামূলক ভেজা শীতের সম্ভাবনা রয়েছে।

খাদ্য সরবরাহে ধাক্কার আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর ফলে বিশ্ব খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ভুট্টা ও ধানের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং ব্রাজিলের মতো কৃষিনির্ভর দেশগুলি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

২০২৭ কি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর?

অনেক জলবায়ু বিজ্ঞানীর ধারণা, এল নিনোর পূর্ণ প্রভাব সাধারণত কিছুটা দেরিতে অনুভূত হয়। সেই কারণে ২০২৭ সাল বৈশ্বিক উষ্ণতার নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। বিজ্ঞানী মার্শাল বার্কের মতে, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও ধীর করে দেয়। অতিরিক্ত গরম উৎপাদনশীলতা কমায়, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় এবং কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতি ডেকে আনে।

কেন এত উদ্বেগ?

সাধারণত এল নিনো গ্রীষ্মে তৈরি হয়, শরৎ বা শীতের শুরুতে সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছায় এবং পরের বসন্তে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু এ বারের এল নিনো শুরু থেকেই অস্বাভাবিক শক্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েল ভেচি বলেছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর থেকে উষ্ণ জল দ্রুত উপরে উঠে আসছে—যা অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর লক্ষণ।

ইতিমধ্যেই এই আবহাওয়া ঘটনাকে কেউ “সুপার এল নিনো”, কেউ আবার “গডজিলা এল নিনো” নামে ডাকতে শুরু করেছেন।

তবে বিজ্ঞানীদের বার্তা আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতি। মুহম্মদ আজহার এহসানের কথায়, “ভয় পাওয়ার বদলে আমাদের প্রস্তুত হওয়া উচিত।”

বিশ্ব যখন ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিপর্যস্ত, তখন এই সম্ভাব্য ‘সুপার এল নিনো’ আগামী এক-দেড় বছরে পৃথিবীর আবহাওয়া, কৃষি, অর্থনীতি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর ছাপ ফেলতে পারে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles