হাইলাইটস:

  • সই জালিয়াতি মামলায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিআইডি দফতরে হাজিরা দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
  • টানা পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
  • কলকাতা হাই কোর্ট আগেই তিন সপ্তাহের জন্য তাঁকে গ্রেপ্তারি-সহ কোনও ‘কোয়েরসিভ অ্যাকশন’ থেকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিয়েছে।
  • বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রস্তাবে কয়েকজন তৃণমূল বিধায়কের সই জাল করার অভিযোগ ঘিরেই তদন্ত।
  • অভিষেক তদন্তে সহযোগিতা করেছেন বলে দাবি তাঁর আইনজীবীদের, অন্যদিকে সিআইডি সূত্রে জানা যাচ্ছে তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে।

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার আবহে সই জালিয়াতি মামলাকে কেন্দ্র করে নতুন মাত্রা যোগ করল তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ মেনে তিনি সিআইডি দফতরে হাজির হন। তারপর টানা পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তদন্তকারীদের প্রশ্নের মুখোমুখি থাকতে হয় তাঁকে।

মামলাটির কেন্দ্রে রয়েছে বিধানসভা নির্বাচনের পর বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের জন্য তৈরি একটি প্রস্তাবপত্র। অভিযোগ, সেই প্রস্তাবে কয়েকজন নবনির্বাচিত তৃণমূল বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁদের সম্মতি ছাড়াই তাঁদের নামে সই দেখানো হয়েছে। এই অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয় এবং বিষয়টি সিআইডির তদন্তের আওতায় আসে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবীরা কলকাতা হাই কোর্টে সিআইডির পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আবেদন জানান। বিচারপতি কৌশিক চন্দ্রের বেঞ্চে শুনানির পর আদালত স্পষ্ট করে দেয়, তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে, তবে আপাতত তাঁর বিরুদ্ধে কোনও জোরপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। আদালত তিন সপ্তাহের জন্য তাঁকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেয় এবং সেদিনই সন্ধ্যা ৬টায় সিআইডির সামনে হাজির হতে নির্দেশ দেয়।

সেই নির্দেশ মেনেই নির্ধারিত সময়ে ভবানী ভবনে পৌঁছন অভিষেক। তদন্তকারী আধিকারিকদের একটি বিশেষ দল তাঁর জেরা চালায়। সূত্রের খবর, প্রশ্নের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবপত্র তৈরির প্রক্রিয়া, দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, বিধায়কদের সই সংগ্রহের বিষয় এবং সেই নথি কারা প্রস্তুত করেছিলেন।

তদন্তকারীরা জানতে চান, ওই নথি তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কী ছিল এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনও নির্দেশ দিয়েছিলেন কি না। এছাড়া প্রস্তাবপত্রের খসড়া, যোগাযোগের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক বৈঠক নিয়েও একাধিক প্রশ্ন করা হয় বলে জানা গেছে।

যদিও আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে জানিয়ে দিয়েছে যে কোনও অভিযুক্তকে এমন নথি জমা দিতে বাধ্য করা যায় না যা তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। সংবিধানের ২০(৩) অনুচ্ছেদে স্বীকৃত নিজের দোষ স্বীকারে বাধ্য না করার অধিকারকে সামনে রেখেই আদালত এই মন্তব্য করে। ফলে তদন্তকারীরা প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের উপরেই বেশি জোর দেন।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, তিনি তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন এবং সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এই মামলা সামনে আনা হয়েছে।

অন্যদিকে তদন্তকারী সংস্থার অবস্থান অনেক বেশি সতর্ক। সিআইডি সূত্রে জানা যাচ্ছে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় প্রাপ্ত তথ্য ও অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণ মিলিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে আরও কয়েকজন বিধায়ক, দলীয় সংগঠক এবং নথি প্রস্তুতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও ডাকা হতে পারে।

এই মামলার রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বিভাজন, একাধিক বিধায়কের বিদ্রোহ এবং দলত্যাগের আবহে সই জালিয়াতির অভিযোগ বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ছবি তুলে ধরতেই এই ধরনের কারচুপি করা হয়েছিল। যদিও তৃণমূল নেতৃত্ব বারবার সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মামলার তদন্ত এখন শুধুমাত্র একটি ফৌজদারি অভিযোগের সীমায় আটকে নেই। এটি তৃণমূলের সাংগঠনিক কার্যপ্রণালী, দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ সংকটের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে। ফলে তদন্তের অগ্রগতি আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

বৃহস্পতিবার গভীর রাত পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ চলার পর সিআইডি দফতর থেকে বেরিয়ে যান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সাংবাদিকদের কোনও বিস্তারিত মন্তব্য করেননি। শুধু জানান, আদালতের নির্দেশ মেনে তিনি তদন্তে সহযোগিতা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন।

এখন নজর আদালতের পরবর্তী শুনানি এবং সিআইডির তদন্তের গতিপ্রকৃতির দিকে। আগামী কয়েক সপ্তাহে তদন্তকারী সংস্থা কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এবং সেই তথ্য মামলার মোড় ঘোরাতে পারে কি না, সেটাই হয়ে উঠেছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলের প্রধান আলোচ্য বিষয়। সই জালিয়াতির অভিযোগ শেষ পর্যন্ত কতটা আইনি ভিত্তি পায়, তা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ। তবে আপাতত এটা স্পষ্ট যে এই মামলা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে চাপ বাড়িয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের উপর।