Table of Contents
হাইলাইটস
- বিশ্বকাপ শুরুর প্রাক্কালে সমালোচকদের উদ্দেশে ফুটবলপ্রেমীদের “চিল” বা শান্ত থাকার পরামর্শ দিলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
- ভিসা জটিলতা, অভিবাসন নিষেধাজ্ঞা ও উচ্চ টিকিটমূল্য নিয়ে ফিফার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খারিজ করলেন তিনি।
- জাতিসংঘের সমালোচনার মুখেও মার্কিন সরকারের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সমর্থন করলেন ইনফান্তিনো।
- ইরানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাকে নিজের ও ফিফার বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেন।
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর ভূমিকাকেও বিশেষভাবে প্রশংসা করলেন ফিফা প্রধান।
বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরুর ঠিক আগের দিন সমালোচনার মুখে পড়ে রীতিমতো আত্মপক্ষ সমর্থনে নামলেন ফিফা সভাপতি Gianni Infantino। সংবাদমাধ্যমের সামনে দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি ফুটবলপ্রেমী ও সমালোচকদের উদ্দেশে বলেন, “কখনও কখনও একটু শান্ত হওয়া এবং আমাদের ওপর ভরসা রাখা দরকার। চিৎকার-চেঁচামেচি সবসময় সমাধান এনে দেয় না।”
মেক্সিকো সিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইনফান্তিনো প্রায় ৩৫ মিনিট ধরে একটানা বক্তব্য রাখেন। এরপর সীমিত সংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দেন আরও প্রায় ৪০ মিনিট। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপকে ঘিরে তিনটি বিতর্কিত বিষয়—টিকিটের মূল্য, ইরানের অংশগ্রহণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি।
“আমরা চাঁদে নই, পৃথিবীতে বাস করি”
বিশ্বকাপের অন্যতম বড় বিতর্ক হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতি। চারটি অংশগ্রহণকারী দেশের সমর্থকদের ওপর ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। এমনকি সোমালিয়ার আন্তর্জাতিক রেফারি Omar Artan-কেও মিয়ামি বিমানবন্দরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
এই ঘটনায় জাতিসংঘ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানালেও ইনফান্তিনো মার্কিন প্রশাসনের পক্ষেই অবস্থান নেন।
তিনি বলেন, “আমরা চাঁদে বাস করি না, পৃথিবীতে বাস করি। আমরা বিশ্বের রাজা নই যে সরকার বা পুলিশ বাহিনীকে নির্দেশ দেব। আমরা একটি ক্রীড়া সংস্থা, এবং যতটা সম্ভব সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, “ধরা যাক ২০৩৫ সালের নারী বিশ্বকাপ যুক্তরাজ্যে হলো। তখন কি স্বাভাবিক মনে হবে যদি ফিফা ব্রিটিশ সরকারকে বলে দেয় কাকে দেশে ঢুকতে দিতে হবে আর কাকে নয়?”
ইনফান্তিনোর মতে, বর্তমান বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়াই স্বাভাবিক।
“দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা একটি আক্রমণাত্মক পৃথিবীতে বাস করছি। নিরাপত্তা সবার আগে।”
“চিল মানে বসে থাকা নয়”
সমালোচকদের উদ্দেশে নিজের ‘চিল’ মন্তব্য ব্যাখ্যা করতেও ভোলেননি ফিফা সভাপতি।
তিনি বলেন, “আমি যখন বলি শান্ত থাকুন, তার মানে এই নয় যে বসে থাকুন এবং কিছু করবেন না। আমি বলতে চাই, আমাদের ওপর আস্থা রাখুন। আমরা সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। কখনও সফল হই, কখনও হই না।”
এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করতে চেয়েছেন যে ফিফা সমস্যাগুলো অস্বীকার করছে না, বরং সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সমাধানের চেষ্টা করছে।
টিকিটের দাম নিয়ে কড়া সাফাই
বিশ্বকাপের টিকিটমূল্য নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। অনেক সমর্থকের অভিযোগ, ম্যাচ দেখার খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
ইনফান্তিনো অবশ্য এই অভিযোগ একেবারেই মানতে নারাজ।
তিনি জানান, ইতিমধ্যে ৬০ লক্ষেরও বেশি টিকিট বিক্রি হয়েছে এবং চাহিদা প্রত্যাশার চেয়ে অন্তত দশগুণ বেশি।
তাঁর যুক্তি, টিকিট আরও সস্তা করা হলে সেগুলো কালোবাজারে আরও বেশি দামে বিক্রি হতো।
“আমাদের সর্বনিম্ন টিকিটের দাম ৬০ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় প্লে-অফ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার তুলনায় কম। গড় মূল্য ৫০০ ডলার, সেটাও অনেক আমেরিকান প্লে-অফের গড় মূল্যের নিচে।”
তিনি বলেন, “আমরা যখন সেকেন্ডারি মার্কেটে টিকিট বিক্রি হতে দেখি, তখন সেগুলো আরও বেশি দামে বিক্রি হয়। সেটাই প্রমাণ করে যে মূল দামটি সঠিক ছিল।”
“প্রতিটি ডলার ফুটবলের জন্য”
টিকিট ও সম্প্রচারস্বত্ব থেকে আসা অর্থের ব্যবহারের বিষয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন ইনফান্তিনো।
তাঁর দাবি, ফিফা যে অর্থ আয় করে তার প্রতিটি ডলারই শেষ পর্যন্ত ফুটবলের উন্নয়নে ব্যয় হয়।
“আমরা চাইলে টেলিভিশন সম্প্রচারস্বত্ব কেবল পে-টিভির কাছে বিক্রি করে চারগুণ বেশি আয় করতে পারতাম। তখন হয়তো সব টিকিট বিনামূল্যে দিতে পারতাম। কিন্তু সেগুলোও শেষ পর্যন্ত কালোবাজারে চলে যেত।”
ফিফা সভাপতি বলেন, “আমাদের একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। আমরা এমন দেশেও বিনিয়োগ করি যেখানে আর কেউ করে না—যেমন দক্ষিণ সুদান বা ভুটান। এই কাজ আর কেউ করছে না।”
ইরানের অংশগ্রহণকে নিজের সাফল্য হিসেবে দেখছেন
বিশ্বকাপে Iran-এর অংশগ্রহণ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থার কারণে অনেকেই মনে করেছিলেন ইরান শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে খেলতে পারবে না।
কিন্তু ইনফান্তিনো দাবি করেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন।
“মার্চ মাসে আমি তুরস্কে গিয়ে ইরান দলের সঙ্গে দেখা করি। তখন সবাই বলছিল তাদের আসা অসম্ভব। আমি তাদের বলেছিলাম, তোমরা আসবে। প্রয়োজন হলে আমি নিজেই বাস নিয়ে ইরানে যাব এবং তোমাদের এখানে নিয়ে আসব।”
হাস্যরসের সুরে তিনি যোগ করেন, “ওরা বলেছিল, বাস তারা নিজেরাই চালিয়ে আনবে।”
ফিফা সভাপতি বলেন, “এই পরিস্থিতিতে আর কে নিশ্চিত করতে পারত যে ইরান এসে খেলবে?”
ট্রাম্পকে বিশেষ ধন্যবাদ
সংবাদ সম্মেলনের শেষে ইনফান্তিনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তাঁর কথায়, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সহযোগিতা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ আয়োজন করা সম্ভব হতো না।”
ইনফান্তিনো বলেন, “তাঁর সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। তিনি খুব দ্রুত বিশ্বকাপের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন এবং আয়োজন সফল করতে সাহায্য করেছেন।”
সমালোচনার ঝড় থামেনি
তবে ইনফান্তিনোর দীর্ঘ ব্যাখ্যা সমালোচকদের কতটা সন্তুষ্ট করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই অভিবাসন নীতি, ভিসা জটিলতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং টিকিটের মূল্য নিয়ে বিতর্ক বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরটিকে ঘিরে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
ফিফা সভাপতির বার্তা অবশ্য পরিষ্কার—সমস্যা আছে, সমাধানের চেষ্টা চলছে, আর এখন ফুটবলপ্রেমীদের উচিত মাঠের খেলায় মন দেওয়া। তাঁর ভাষায়, “শান্ত থাকুন, আমাদের ওপর ভরসা রাখুন, আর বিশ্বকাপ উপভোগ করুন।”