বাংলাস্ফিয়ার: ভুয়ো খবর, গুজব এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারের মোকাবিলায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিশেষ ‘ওয়ার রুম’ গঠন করেছে। নবান্নের উদ্যোগে তৈরি এই বিশেষ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রাজ্যজুড়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের উপর ২৪ ঘণ্টা নজর রাখবে। একই সঙ্গে কোনও সংবেদনশীল ঘটনা নিয়ে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে দ্রুত তার সত্যতা যাচাই করে সরকারি অবস্থান প্রকাশ করার দায়িত্বও থাকবে এই ওয়ার রুমের।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা, প্রশাসনিক পদক্ষেপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সরকারি প্রকল্প নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ভুয়ো তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিকৃত ছবি, পুরনো ভিডিও কিংবা ভিত্তিহীন দাবি মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার লক্ষ্যেই নতুন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
ওয়ার রুমে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, সামাজিক মাধ্যম বিশ্লেষক, তথ্য যাচাইকারী এবং বিভিন্ন সরকারি দফতরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সমন্বিত দল গঠন করা হয়েছে। কোনও পোস্ট বা ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হলে প্রথমেই তার উৎস ও সত্যতা যাচাই করা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সরকারি ব্যাখ্যা বা খণ্ডন প্রকাশ করা হবে।
সরকারের দাবি, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ভুয়ো তথ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং মানুষের কাছে নির্ভুল তথ্য পৌঁছে দেওয়া। প্রশাসনের মতে, ডিজিটাল যুগে তথ্য ছড়িয়ে পড়ার গতি এত বেশি যে অনেক সময় গুজব সরকারি ব্যাখ্যার আগেই লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে একটি কেন্দ্রীভূত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল।
এই ওয়ার রুম ফেসবুক, এক্স, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ-সহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের উপর নজর রাখবে। বিশেষ করে এমন পোস্টগুলিকে চিহ্নিত করা হবে, যেগুলি জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করতে পারে, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে অথবা সরকারি নীতি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে।
সূত্রের খবর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ প্রযুক্তিও এই ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে কোন তথ্য কত দ্রুত ছড়াচ্ছে, কোন অঞ্চল বা গোষ্ঠীতে তার প্রভাব বেশি এবং কীভাবে তার মোকাবিলা করা উচিত, তা দ্রুত বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে বিতর্কও শুরু হয়েছে। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, ভুয়ো তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে সরকারের সমালোচনাকারীদের উপর নজরদারি বাড়ানো হতে পারে। তাঁদের মতে, ভুয়ো খবর রোধ জরুরি হলেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন কোনওভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে রাজ্য সরকারের বক্তব্য, এই ওয়ার রুম কোনওভাবেই মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়। এর একমাত্র লক্ষ্য দ্রুত তথ্য যাচাই, গুজব প্রতিরোধ এবং মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া। প্রশাসনের দাবি, সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় ভুয়ো খবরের কারণে অযথা আতঙ্ক এবং বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে সেই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতেই এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে।
ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ভুয়ো তথ্যও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সেই বাস্তবতায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই ‘ওয়ার রুম’ কতটা কার্যকর হয় এবং একই সঙ্গে তথ্যের স্বচ্ছতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে কতটা ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।