হাইলাইটস
- ইউরোপের মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ এখন আমেরিকাকে প্রকৃত মিত্র বলে মনে করেন।
- অধিকাংশ ইউরোপীয় বিশ্বাস করেন না যে আক্রমণের মুখে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে।
- ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি, ন্যাটো নিয়ে সংশয় এবং ইউরোপে মার্কিন সেনা কমানোর হুমকি এই অবিশ্বাসের প্রধান কারণ।
- ইউরোপীয়দের বড় অংশ এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার পক্ষে।
- তবুও ন্যাটোর বিকল্প হিসেবে শুধুমাত্র ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা জোট গঠনের পক্ষে সমর্থন এখনও সীমিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপের নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ন্যাটো জোটের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ইউরোপকে শুধু সামরিক সুরক্ষাই দেয়নি, বরং রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই দীর্ঘদিনের বিশ্বাসে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (ইসিএফআর)-এর একটি নতুন সমীক্ষা দেখাচ্ছে, ইউরোপীয়দের মধ্যে আমেরিকার প্রতি আস্থা এখন ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৫টি ইউরোপীয় দেশে পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে প্রকৃত মিত্র হিসেবে দেখছেন। ছয় মাস আগেও এই সংখ্যা ছিল ১৬ শতাংশ, আর ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ছিল ২২ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান শুধু একটি মতামত জরিপ নয়; এটি ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে।
ইসিএফআরের গবেষক ইয়ানা কোবজোভা এবং পাওয়েল জেরকার মতে, ইউরোপে এখন “আমেরিকার প্রতি গভীর অবিশ্বাস” তৈরি হয়েছে। তাদের ভাষায়, ইউরোপীয়রা ক্রমশ মনে করছেন যে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আর পুরোপুরি ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করে থাকা সম্ভব নয়।
এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি। হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর ট্রাম্প বারবার ন্যাটোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন, এমনকি একাধিকবার বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো থেকে বেরিয়েও যেতে পারে। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগ্রাসী মন্তব্য এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক পদক্ষেপও ইউরোপীয়দের উদ্বিগ্ন করেছে।
ফলস্বরূপ, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, যদি তাদের দেশ কোনও সামরিক আক্রমণের মুখে পড়ে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিতভাবে সাহায্যে এগিয়ে আসবে—এমন নিশ্চয়তা আর নেই।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই সন্দেহ শুধু বামপন্থী বা উদারপন্থী ভোটারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস এবং সুইডেনের মতো দেশে, যেখানে দক্ষিণপন্থী ও জাতীয়তাবাদী দলগুলির প্রভাব উল্লেখযোগ্য, সেখানেও একই ধরনের সংশয় দেখা যাচ্ছে।
তবে আমেরিকার প্রতি আস্থা কমলেও ইউরোপ নিজের ওপর আস্থা হারায়নি। বরং উল্টোটা ঘটছে। অধিকাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সংকটের সময় অন্য ইউরোপীয় দেশগুলি তাদের পাশে দাঁড়াবে। অর্থাৎ, “আমেরিকান ছাতা” দুর্বল হলেও “ইউরোপীয় সংহতি”র ধারণা শক্তিশালী হচ্ছে।
এই মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে জনমতেও। গত বছরের তুলনায় গড়ে ৪ শতাংশ বেশি মানুষ এখন নিজেদের দেশের সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে। ইতালি ছাড়া প্রায় সব দেশেই প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার পক্ষে সমর্থন বেড়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, ইউরোপীয় অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার দাবিও জোরালো হচ্ছে। ডেনমার্কে ৭৫ শতাংশ, নেদারল্যান্ডসে ৭২ শতাংশ এবং সুইডেনে ৭০ শতাংশ মানুষ চান, তাদের দেশ মার্কিন অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপীয় নির্মাতাদের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনুক। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল এবং ব্রিটেনেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তবে এই পরিবর্তনেরও সীমা আছে। মানুষ বেশি প্রতিরক্ষা ব্যয় চাইলেও তার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সামাজিক কল্যাণ খাতে কাটছাঁট করতে রাজি নয়। ইতালি, জার্মানি, স্পেন এবং অস্ট্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই ধরনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, ইউরোপীয়রা এখনও ন্যাটোকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে প্রস্তুত নন। মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ শুধুমাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নভিত্তিক একটি নতুন প্রতিরক্ষা জোট গঠনের পক্ষে মত দিয়েছেন। অর্থাৎ, ন্যাটো নিয়ে হতাশা থাকলেও তার বিকল্প হিসেবে কোনও পূর্ণাঙ্গ কাঠামোর প্রতি এখনও ব্যাপক সমর্থন তৈরি হয়নি।
সমীক্ষার আরেকটি বার্তা হল, অধিকাংশ ইউরোপীয় মনে করেন ট্রাম্পের রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হলে আমেরিকা-ইউরোপ সম্পর্ক আবার উন্নত হতে পারে। ফ্রান্স, স্পেন, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস এবং সুইডেনে ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
সব মিলিয়ে এই সমীক্ষা ইউরোপীয় রাজনীতির একটি বড় পরিবর্তনের ছবি তুলে ধরছে। কয়েক দশক ধরে ইউরোপের নিরাপত্তার সমার্থক ছিল আমেরিকার সামরিক শক্তি। এখন সেই বিশ্বাস নড়বড়ে। ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছে না, কিন্তু অন্ধ নির্ভরতাও আর রাখতে চাইছে না।
বিশ্ব রাজনীতির নতুন বাস্তবতায় ইউরোপের বার্তা স্পষ্ট—বন্ধুত্ব থাকবে, সহযোগিতাও থাকবে, কিন্তু নিজের নিরাপত্তার চাবিকাঠি আর একমাত্র ওয়াশিংটনের হাতে তুলে রাখতে তারা আর রাজি নয়।