সামরিক নয়, অর্থনৈতিক যুদ্ধেই ট্রাম্পকে কাবু করতে চায় তেহরান

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: ইরানে মার্কিন-ইজরায়েলি সামরিক অভিযান চতুর্থ সপ্তাহে পা দিতেই পরিস্থিতি আরও জটিল ও বিস্ফোরক হয়ে উঠছে।
- একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানাচ্ছে, তেহরান কোনো 'বেরোনোর পথ' খুঁজে নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না বরং সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়ানোকেই তারা কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে।
- অঞ্চলটির বিভিন্ন কূটনীতিক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা এই যুদ্ধে ইরান এখন অন্য পথ নিয়েছে—সংযম নয়, বরং উত্তেজনা বাড়ানোই তার…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: ইরানে মার্কিন-ইজরায়েলি সামরিক অভিযান চতুর্থ সপ্তাহে পা দিতেই পরিস্থিতি আরও জটিল ও বিস্ফোরক হয়ে উঠছে। একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানাচ্ছে, তেহরান কোনো ‘বেরোনোর পথ’ খুঁজে নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না বরং সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়ানোকেই তারা কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে। অঞ্চলটির বিভিন্ন কূটনীতিক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা এই যুদ্ধে ইরান এখন অন্য পথ নিয়েছে—সংযম নয়, বরং উত্তেজনা বাড়ানোই তার কৌশল।
হরমুজ প্রণালী: যুদ্ধের মূল রণক্ষেত্র
ইরানের আপসহীন মনোভাবের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী যে জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবাহিত হয়। তেহরান এই প্রণালী আংশিকভাবে বন্ধ করে দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।
এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন — এই জলপথ না খুললে ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো “সম্পূর্ণ ধ্বংস” করে দেওয়ার হুমকি দেন তিনি।
এক ইরানি কূটনীতিকের ভাষায়, প্রণালী আংশিক বন্ধ রেখে ইরান এই যুদ্ধকে আক্রমণকারীদের জন্য “অত্যন্ত ব্যয়বহুল” করে তুলতে চাইছে। তিনি বলেন, “আমরা ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক পরাশক্তির বিরুদ্ধে একা লড়ছি।”
পারস্য উপসাগরে নিযুক্ত এক ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, ইরানের কাছে আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি করা এবং জ্বালানির দাম বাড়িয়ে বিশ্ববাজারকে চাপে রাখাই এখন জয়ের মাপকাঠি। তাঁর মতে, আলোচনায় বসতে তেহরান এখন কোনো চাপই অনুভব করছে না।
পেন্টাগনের পাল্টা তৎপরতা
ট্রাম্পের আল্টিমেটামের আগেই পেন্টাগন হরমুজ প্রণালীর আশেপাশে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়। বিমান হামলা জোরদার করা হয়, মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার। এই জলপথ জোর করে খুলতে হলে প্রথমে ইরানের প্রতিরক্ষা অবস্থানগুলো ধ্বংস করতে হবে, তবেই মার্কিন যুদ্ধজাহাজ তেলের ট্যাঙ্কারগুলোকে নিরাপদে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।
একইসঙ্গে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ শুক্রবার বাজার কিছুটা স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে একটি পদক্ষেপ নেয় — ইরানের যেসব অপরিশোধিত তেল ইতিমধ্যেই জাহাজে তোলা হয়েছে, তার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হয়।
যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
কাতার ও ওমানের কর্মকর্তারা গত সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে যোগাযোগ করেন। তাদের মূল্যায়ন ছিল, আমেরিকা ও ইজরায়েলের সামরিক শক্তি অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও স্বল্প সময়ে ইরান সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব নয়। কিন্তু তেহরানের জবাব ছিল স্পষ্ট — প্রথমে আক্রমণ বন্ধ করতে হবে, তবেই আলোচনা।
ওই ইরানি কূটনীতিক জানান, “গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের মতো কোনো আগাম যুদ্ধবিরতিতে আমরা রাজি নই।” তিনি জানান, আমেরিকাকে “আক্রমণবিরোধী” নিশ্চয়তা দিতে হবে, যার মধ্যে যুদ্ধক্ষতির আর্থিক ক্ষতিপূরণও অন্তর্ভুক্ত। তাঁর ভাষায়, “এটাই সেই শুরু, যেখানে আমেরিকা এক গভীর পাঁকে আটকে পড়ছে। এখান থেকে বেরোনোর আর কোনো পথ নেই।”
ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, বেসামরিক মৃত্যু
পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকা ও ইজরায়েল ইতিমধ্যে ইরানের ভেতরে ১৫ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এতে সামরিক অবকাঠামো ও পৌরভবন ধ্বংস হয়েছে, নিহত হয়েছেন উচ্চপদস্থ নেতৃত্বের বহু সদস্য। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, সংঘাতে এ পর্যন্ত ১,২০০-র বেশি বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে একটি স্কুলে হামলায় নিহত হয়েছে ১৬০-র বেশি শিশু।
এই সংঘাত এখন আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার জবাবে ইরান কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতে পাল্টা আঘাত হানে। কাতারের একটি গ্যাস স্থাপনায় বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
শীর্ষ নেতাদের হত্যা: আলোচনার পথ বন্ধ
গত সপ্তাহে ইসরায়েলের হামলায় চারজন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি এবং ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পসের মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নায়েনি।
এক ইউরোপীয় কর্মকর্তার মতে, পশ্চিমা কূটনীতিকদের কাছে লারিজানি ছিলেন তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ। ইউরোপীয় চ্যানেলে দীর্ঘদিন ধরে চলা সেই অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক এবং সাম্প্রতিক মস্কো-মধ্যস্থ আলোচনার উদ্যোগ — সবই এখন তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেছে।
ওই কর্মকর্তা মনে করেন, এই হত্যাকাণ্ডগুলো স্বল্পমেয়াদে শাসকশ্রেণির মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তাদের আরও অনমনীয় করে তুলতে পারে।
দৃঢ়তার আড়ালে গভীর উদ্বেগ
ইরানের নেতৃত্ব প্রকাশ্যে দৃঢ়তার বার্তা দিলেও ভেতরে ভেতরে গভীরভাবে চিন্তিত। নওরোজ উপলক্ষে নেতাদের বার্তায় শোকের পাশাপাশি শত্রুকে পরাজিত করার অঙ্গীকার ছিল স্পষ্ট। সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ঘোষণা করেন, “এই নতুন বছর হবে শত্রুদের উপর শক্তিশালী আঘাত হানার বছর।”
নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই লিখিত বিবৃতি দিলেও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জনসমক্ষে আসেননি। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, তাঁর পিতার হত্যাকাণ্ডে তিনি নিজেও গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।
নববর্ষের আগের দিন রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম তিনটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর দেয় — যা চলতি বছরের প্রতিবাদ আন্দোলনের পর প্রথম স্বীকৃত মৃত্যুদণ্ড। নিহতদের একজন ১৯ বছর বয়সী কুস্তিগির সালেহ মোহাম্মদি, যাঁকে বিক্ষোভকালে পুলিশের উপর হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: সংকটের আসল মুহূর্ত এখনও আসেনি
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ফেলো অ্যালান আইর বলেন, “আমরা এখনও ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পথে রয়েছি। ইরানের নেতৃত্ব বিশ্বাস করে, যথেষ্ট অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারলে তারা ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করতে পারবে।”
পারস্য উপসাগরে নিযুক্ত এক ইউরোপীয় কূটনীতিক জানান, এখন পর্যন্ত এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব আমেরিকা ও ইউরোপের উপর “মধ্যম” মাত্রার অর্থাৎ ওয়াশিংটনকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করার মতো কোনো সংকট এখনও তৈরি হয়নি। তবে জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
প্রাক্তন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা রিউয়েল মার্ক গেরেখ্ট সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হয়তো স্বল্পমেয়াদে ইরানের পক্ষে যেতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা উল্টো ফল দেবে। হাজার হাজার বিমান হামলায় সৃষ্ট ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ইরানের সরকারের পক্ষে জনঅসন্তোষ সামলানো আরও কঠিন করে তুলবে।
তাঁর ভাষায়, “সবচেয়ে সংকটজনক মুহূর্ত যুদ্ধ চলাকালীন নয় বরং তখন, যখন এই আঘাত থেমে যাবে।”
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



