ছত্তীসগঢ়ের লোকসংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়া পদ্মবিভূষণ শিল্পীর প্রয়াণে শোকের ছায়া
হাইলাইটস:
- ৭০ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন পাণ্ডবানি শিল্পের সর্বাধিক পরিচিত মুখ তীজন বাই।
- দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর রায়পুরের এইমসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
- মহাভারতের কাহিনি গীত, আবৃত্তি ও নাট্যাভিনয়ের মিশেলে পরিবেশনের অনন্য শিল্পকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছিলেন।
- পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ-সহ একাধিক সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন এই কিংবদন্তি শিল্পী।
- তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় লোকসংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
ভারতের লোকসংস্কৃতির আকাশ থেকে ঝরে পড়ল আর এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ছত্তীসগঢ়ের প্রখ্যাত পাণ্ডবানি শিল্পী তীজন বাই রবিবার ৭০ বছর বয়সে প্রয়াত হন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর রায়পুরের অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এইমস)-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গত ২৭ মে থেকে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। তাঁর মৃত্যুতে শুধু ছত্তীসগঢ় নয়, সমগ্র দেশের সাংস্কৃতিক জগতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ছত্তীসগঢ়ের দুর্গ জেলার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া তীজন বাই অত্যন্ত অল্প বয়স থেকেই পাণ্ডবানির সঙ্গে যুক্ত হন। পাণ্ডবানি হল ছত্তীসগঢ়ের এক প্রাচীন লোকশিল্প, যেখানে মহাভারতের নানা পর্ব গানের সুর, নাটকীয় বর্ণনা এবং অভিনয়ের সমন্বয়ে পরিবেশন করা হয়। বহু শতাব্দী ধরে এই শিল্পধারা গ্রামীণ সমাজে জনপ্রিয় হলেও তীজন বাই-ই একে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করে দেন।
তাঁর কণ্ঠের শক্তি, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি এবং অভিনয়ক্ষমতা দর্শকদের মুগ্ধ করত। হাতে তাম্বুরা নিয়ে তিনি কখনও ভীষ্ম, কখনও অর্জুন, কখনও দ্রৌপদী, আবার কখনও কৃষ্ণের চরিত্রে যেন প্রাণ সঞ্চার করতেন। কেবল গান নয়, মুখভঙ্গি, সংলাপ, শরীরী ভাষা এবং নাটকীয় উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি মহাভারতের ঘটনাগুলিকে জীবন্ত করে তুলতেন। তাঁর পরিবেশনা ছিল একাধারে সংগীত, নাটক এবং মৌখিক কাব্যের অনন্য সংমিশ্রণ।
তীজন বাইয়ের শিল্পজীবন সহজ ছিল না। এমন এক সময়ে তিনি পাণ্ডবানি পরিবেশন শুরু করেছিলেন, যখন এই শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণকে সমাজের অনেকেই ভালো চোখে দেখতেন না। নানা বাধা, সামাজিক কটূক্তি এবং আর্থিক সংকট সত্ত্বেও তিনি নিজের পথ থেকে সরে যাননি। বরং প্রতিকূলতাকেই শক্তিতে পরিণত করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে প্রতিভা কোনও সামাজিক প্রথার কাছে মাথা নত করে না।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া এবং বিশ্বের নানা দেশে ভারতীয় লোকসংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর পরিবেশনা বিদেশি দর্শকদের কাছেও সমানভাবে প্রশংসিত হয়। ভাষা না বুঝলেও তাঁর কণ্ঠ, অভিব্যক্তি এবং নাটকীয় উপস্থাপনা দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। এভাবেই পাণ্ডবানিকে তিনি বিশ্বমানচিত্রে একটি স্বীকৃত লোকশিল্পের মর্যাদা এনে দেন।
ভারত সরকার তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ এবং দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণে সম্মানিত করে। এছাড়া সংগীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার-সহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মান তাঁর ঝুলিতে এসেছে। এই সম্মানগুলি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বীকৃতি নয়, বরং ভারতের লোকশিল্পের মর্যাদাকেও আরও উঁচুতে তুলে ধরেছে।
তাঁর মৃত্যুতে শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিপ্রেমী এবং রাজনৈতিক মহলের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলেছেন, তীজন বাই এমন এক শিল্পী, যিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন লোকসংস্কৃতি কখনও কেবল গ্রামবাংলা বা আঞ্চলিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না; সঠিক শিল্পীসত্তা থাকলে তা বিশ্বজুড়ে মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে পারে।
সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞদের মতে, তীজন বাইয়ের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল একটি প্রাচীন মৌখিক শিল্পধারাকে আধুনিক সময়ে নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা। তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন এক চলমান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। তাঁর পরিবেশনার মধ্য দিয়ে মহাভারতের নৈতিকতা, বীরত্ব, মানবিকতা এবং সংগ্রামের কাহিনি নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠত।
তীজন বাইয়ের প্রয়াণে ভারতীয় লোকসংস্কৃতি অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ল। তবে তাঁর কণ্ঠে গাওয়া পাণ্ডবানির অমর সুর, তাঁর অভিনয়ের শক্তি এবং শিল্পের প্রতি আজীবনের নিষ্ঠা আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের পথ দেখাবে। তিনি হয়তো আর মঞ্চে ফিরবেন না, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর উত্তরাধিকার এবং তাঁর শিল্পচেতনা ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।